ক্ষমতার হাওয়া বদলাতেই কি তবে খোলস ছাড়ার পালা? রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহ তৈরি হতেই এবার রঙ বদলাতে মরিয়া খোদ খাস কালীঘাটের সদস্য! আসলে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য ঘিরে এখন তোলপাড় বাংলার রাজনৈতিক মহল। এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে বাবুন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দিদির শাসনে আদতে তিনি কতটা ‘কোণঠাসা’ ছিলেন। আর এই সুযোগেই ময়দানে টিকে থাকতে নিজের ‘ক্রীড়াপ্রেমী’ ভাবমূর্তিকে হাতিয়ার করছেন তিনি। ইতিমধ্যেই বক্সিং এবং হ্যান্ডবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে ইস্তফাও দিয়েছেন বাবুন।
কিন্তু সত্যিই কি মমতার আমলে কোণঠাসা ছিলেন তাঁর নিজের ভাই? নাকি এ কেবলই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে পিঠ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা? বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তিনি নাকি ২০১৩ সাল থেকেই তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, যা কেউ বোঝার চেষ্টা করেনি। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সংঘাতের কথাও এবার প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। বাবুনের সাফ কথা— সুভাষ চক্রবর্তী কিংবা মদন মিত্রের আমলে তিনি কাজ করতে পারলেও, অরূপ বিশ্বাসের জমানায় তিনি শুধুই বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। অরূপ নাকি তাঁকে কোনোদিনই ভালো চোখে দেখেননি, কাজেও দেননি কোনো সমর্থন।
তৃণমূলের অন্দরে যখন এই ফাটল চওড়া হচ্ছে, তখনই বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজর এখন গেরুয়া শিবিরের দিকে। বিজেপি নেতা নিশীথ প্রামাণিকের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হয়েছে এবং তিনি তাঁর সঙ্গেই কাজ করতে চান বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর এই ‘ডিগবাজি’ ঘিরেই স্বাভাবিকভাবে সুর চড়াচ্ছে বিরোধী শিবির। তৃণমূল জমানার ভাইপো-ভাইদের একাধিপত্যকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি।
বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষের এই নিয়ে চাঁছাছোলা আক্রমণ— “ওর যন্ত্রণা তো খোদ দিদিই বুঝতে পারেননি, উল্টে ত্যাজ্য ভাই করেছিলেন।” বিরোধীদের স্পষ্ট অভিযোগ, এতদিন দিদির ক্ষমতা ভাঙিয়ে, দিদির প্রশ্রয়ে যারা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বানিয়েছে, আজ ক্ষমতার রাশ আলগা হতেই তারা ভোলবদল করছে। সজল ঘোষের খোঁচা, “কালীঘাটের মন্দিরের গেটে ভিক্ষা করার যোগ্যতা যাদের নেই, তারা কেবল ভাগ্যগুণে পিসির ভাই হয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। এতদিন তৃণমূলের খেয়েছে, এবার ভাবছে বিজেপির খাবে। কিন্তু নিশীথ প্রামাণিক ওর সাথে কাজ করতে চান না।”
এই ঘটনা শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের আসল চেহারাটাকেই যেন আমজনতার সামনে টেনে আনল। সমালোচকদের প্রশ্ন, যে দিদি গোটা রাজ্য শাসনের দাবি করেন, তাঁর নিজের ঘরের ভেতরেই ভাইয়ে-ভাইয়ে বা মন্ত্রীর সঙ্গে ভাইয়ের এই চরম সমন্বয়হীনতা এবং ক্ষমতার লড়াই কেন? ভাই বাবুনের এই ‘বিদ্রোহ’ আদতে প্রমাণ করে দেয়, তৃণমূলের অন্দরে এতদিন ধরে চলা ক্ষমতার আস্ফালন এবং সিন্ডিকেট রাজ আজ কতটা নড়বড়ে। দিদির দাপটের আড়ালে যে ক্ষোভ আর সুবিধাবাদের রাজনীতি ধিকধিক করে জ্বলছিল, আজ তা প্রকাশ্যে। শেষ পর্যন্ত বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায় নিশীথ প্রামাণিকের হাত ধরে পদ্মশিবিরে ঠাঁই পান কিনা, নাকি রাজনীতির এই খেলায় তিনি নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন— সেটাই এখন দেখার।