শারদোৎসবের আনন্দে যখন গোটা বাংলা মেতে উঠেছে, ঠিক তখনই রাজনৈতিক ও আইনি টানাপোড়েনের জালে জড়িয়ে নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস! ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর একদিকে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে দলের সর্বভারতীয় নাম ও ঐতিহাসিক ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ফ্রিজ হয়ে যাওয়া, আর অন্যদিকে আর্থিক অনিয়মের দায়ে দলের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিতে আইনি তালা— দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে কালীঘাটের অন্দরে এখন চরম হাহাকার। দুর্গাপুজোর বোনাস তো দূর অস্ত, দলের কর্মী-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন মেটানো কিংবা কার্যালয়ের নিয়মিত বাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় তহবিল ব্যবহারের অনুমতি পেতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েও কোনো সুরাহা পেল না ‘মমতা তৃণমূল’। জরুরি শুনানির আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়ে আদালত জানিয়ে দিয়েছে— পুজোর ছুটির আগে কোনো বিশেষ সুবিধা মিলবে না!
ঘটনার সূত্রপাত একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা তৃণমূলের তিনটি প্রধান ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে বিপুল আর্থিক অনিয়ম ও অস্বচ্ছ লেনদেনের অভিযোগে আগেই সক্রিয় পদক্ষেপ করেছিল রাজ্য পুলিশ। পুলিশি পদক্ষেপে অ্যাকাউন্টগুলি পুরোপুরি ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার পর মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। গত ৯ই জুলাই হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল— ২০২৭ সালের ২৯শে জানুয়ারি পর্যন্ত এই অ্যাকাউন্টগুলির ওপর মমতা তৃণমূলের কোনো অবাধ বা একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তবে দলের প্রাত্যহিক সাংগঠনিক খরচ চালানো এবং সাধারণ কর্মচারীদের বেতন মেটানোর স্বার্থে আদালত নিযুক্ত স্পেশ্যাল অফিসার অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হবে।
কিন্তু উৎসবের ঠিক মুখে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। স্পেশ্যাল অফিসারের কমিটি পুজোর আগে ওই সমস্ত অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো তহবিল ছাড়তে পরিষ্কার অস্বীকার করে। শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দলের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ কেবল উপনির্বাচনের জন্যই সীমাবদ্ধ, নাকি তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল রয়েছে— তা নিয়ে আদালতের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দাবি করেন স্পেশ্যাল অফিসার। ফলে আটকে যায় সমস্ত লেনদেন।
এই চরম অর্থসংকটের মুখে পড়ে পুজোর আগে অবিলম্বে তহবিল ছাড়ার অনুমতি চেয়ে এবং মামলার তড়িঘড়ি নিষ্পত্তির আর্জি জানিয়ে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে তড়িঘড়ি আবেদন জানিয়েছিল কালীঘাট শিবির। কিন্তু সেখানেও জোর ধাক্কা খায় তারা। রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে অত্যন্ত জোরালো আইনি সওয়াল তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট যুক্তি দেন— যেহেতু নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্বই এই মুহূর্তে সাময়িকভাবে স্থগিত, তাই সেই স্থগিত নামের ব্যানারে দায়ের করা এই মামলার কোনো আইনসম্মত গ্রহণযোগ্যতাই থাকতে পারে না!
যদিও আদালত পূর্বে জানিয়েছিল যে কমিশনের পদক্ষেপটি অন্তর্বর্তীকালীন, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে পুজোর ছুটির মুখে কোনো ধরনের জরুরি বা তড়িঘড়ি হস্তক্ষেপ করতে পরিষ্কার অস্বীকার করেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে— পুজোর দীর্ঘ ছুটির পর আদালত যখন স্বাভাবিক নিয়মে খুলবে, তখনই এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানি গ্রহণ করা হবে।
আদালতের এই স্পষ্ট নির্দেশের পর পুজোর মুখে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল দলের কার্যালয় ও নিচুতলার কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ। দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে একদিকে আদালতের নজরদারি, আর অন্যদিকে স্পেশ্যাল অফিসারের কড়া পদক্ষেপ— ক্ষমতা ও প্রতীক হারানোর পর উৎসবের মুখে তৃণমূলের এই অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, আইনের ফাঁস কতটা শক্তভাবে চেপে বসেছে কালীঘাটের ওপর