পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা করে, রাজ্যের স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের পোশাক বা ইউনিফর্মের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল রাজ্যের নতুন সরকার। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া বিশ্ববাংলা লোগো সম্বলিত নীল-সাদা রঙের ইউনিফর্মের বাধ্যবাধকতা আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হতে চলেছে।
তোষণ এবং জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার পুরনো অধ্যায়কে চিরতরে ইতি টেনে, শুভেন্দু সরকারের শিক্ষামন্ত্রক রাজ্যের সমস্ত সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং সরকার পোষিত বিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, গরিমা এবং প্রাচীন পরিচিতি ফিরিয়ে দেওয়ার এক অভাবনীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছে। এই নতুন ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্যের প্রতিটি স্কুল কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নিজেদের পছন্দমতো, নিজস্ব রং ও স্টাইলের ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্মে সগৌরবে ফিরে যেতে পারবে।
ইতিমধ্যেই এই বিরাট পরিবর্তনকে বাস্তব রূপ দিতে এবং প্রশাসনিক স্তরে রূপরেখা তৈরি করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রয়োজনীয় হিসেবনিকেশ ও তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছে রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তর। চলতি মাসের ৭ তারিখ শিক্ষা দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব তথা অতিরিক্ত নির্দেশকের স্বাক্ষরিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি আদেশনামা জারি করা হয়েছে।
সেখানে রাজ্যের সমস্ত জেলার প্রাইমারি ও হাইস্কুলের জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক বা ডিআই-দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিটি স্কুলের পোশাক সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় রিপোর্ট এবং তথ্য সংগ্রহ করে সরাসরি রাজ্য দপ্তরে জমা করতে হবে। সরকারের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ সম্পর্কে রাজ্যের নতুন স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও বলিষ্ঠ গলায় জানিয়েছেন যে, ইউনিফর্মের নির্দিষ্ট রং এবং ডিজাইনের সঙ্গে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সংস্কৃতি, সুদীর্ঘ ইতিহাস ও গরিমা জড়িয়ে থাকে। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের বিদ্যালয়ের নিজস্ব ইউনিফর্মের সাথে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর মনস্তাত্ত্বিক আবেগ, ভালোবাসা এবং আত্মসম্মান জড়িয়ে থাকে, যাকে বিগত দিনে জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
মনে রাখা দরকার, ২০২২ সালে তৎকালীন তৃণমূল সরকার এক তুঘলকি সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্যের সমস্ত স্কুলের নিজস্বতা মুছে দিয়ে একই রঙের নীল-সাদা ইউনিফর্ম এবং তাতে স্কুলের লোগো বাদ দিয়ে বিশ্ববাংলা লোগো ছাপানোর নিয়ম চালু করেছিল। সেই সময় রাজ্যের একাধিক ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষক সংগঠন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে তীব্র ও জোরালো আন্দোলন গড়ে তুললেও, অহংকারী তৎকালীন সরকার সাধারণ মানুষের সেই ক্ষোভকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি।
তবে স্কুলগুলোর অন্দরে এই চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের বিরুদ্ধে বরাবরই এক তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ধিকধিক করে জ্বলছিল। শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই হারানো গরিমা এবং স্বাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই সরকার এই নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে এই পরিবর্তনের সাথে সাথেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মায়েদের স্বার্থকেও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে; স্কুলগুলো তাদের আগের পুরোনো রঙের ইউনিফর্মে ফিরে গেলেও পোশাক তৈরির মূল দায়িত্ব কিন্তু আগের মতোই স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির হাতেই থাকবে, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে। তো স্বৈরাচারী নীল-সাদার রাজনীতিকে উপড়ে ফেলে, বাংলার মাটির আসল শিক্ষা সংস্কৃতি ও গরিমাকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন সরকারের এই পরিচ্ছন্ন ও আন্তরিক প্রয়াস সত্যিই এক সোনালী ভোরের অনন্য নজির সৃষ্টি করল।
