বিশ্ব ব্যাঙ্কের সর্বশেষ India Development Update অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.১ শতাংশ করা হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স। বিশ্ব ব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ হতে পারে। এর আগের অর্থবর্ষে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫-এ এই বৃদ্ধির হার ছিল ৭.২ শতাংশ। এই বৃদ্ধির পিছনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুটি বিষয় শক্তিশালী বিনিয়োগ এবং দৃঢ় ব্যক্তিগত খরচ।
কৃষিক্ষেত্রের ভালো পারফরম্যান্স, গ্রামীণ আয়ের সহায়তা, খাদ্য ভর্তুকি এবং তুলনামূলক কম মুদ্রাস্ফীতি এই সমস্ত কারণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সাহায্য করেছে। তবে ছবিটা শুধু গ্রামের মধ্যে আটকে নেই। বিশ্ব ব্যাঙ্কের মতে, বছরের বাকি সময়ে শহুরে চাহিদাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পিছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আয়কর ছাড় এবং GST হ্রাসের প্রভাব। সাধারণ মানুষের হাতে যদি খরচ করার মতো টাকা কিছুটা বেশি থাকে, তাহলে তার একটা অংশ বাজারে ফিরে আসে। আর মানুষ যখন বেশি পণ্য ও পরিষেবা কেনে, তখন ব্যবসার বিক্রি বাড়ে। ব্যবসার বিক্রি বাড়লে উৎপাদন বাড়তে পারে, বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, এপ্রিল মাস থেকে ভারতের শিল্পক্ষেত্রের কার্যকলাপও প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ছিল। এ কারণেই বিশ্ব ব্যাঙ্কের ভারতের বৃদ্ধির পূর্বাভাসে এই বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব ব্যাঙ্ক বিশেষভাবে সতর্ক করেছে জ্বালানির দাম এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে। ভারত-সহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকে, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ বাড়ে।
উৎপাদন খরচ বাড়ে। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার দামও বাড়তে পারে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক চলতি অর্থবর্ষে গড় মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫ শতাংশ থাকার আশা করছে। এদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি Reuters সমীক্ষায় ৭ অক্টোবর ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে এবং ডিসেম্বরে আরও একটি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সুদের হার বাড়লে একদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে ঋণের খরচও বাড়তে পারে। ফলে ব্যবসার বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের বড় ধরনের কেনাকাটার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একদিকে দ্রুত বৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য বিশ্ব ব্যাঙ্কের নজর রয়েছে আরেকটি জায়গায়—Artificial Intelligence বা AI। বিশ্ব ব্যাঙ্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে AI গ্রহণের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
তাদের মতে, ভারতে AI ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
প্রায় ২৩ শতাংশ সংস্থা AI ব্যবহার করছে, যেখানে আমেরিকায় এই হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। AI যদি সঠিকভাবে শিল্প, পরিষেবা, শিক্ষা, গবেষণা এবং ব্যবসায় কাজে লাগানো যায়, তাহলে মধ্যমেয়াদে অর্থনীতির বৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বর্তমানে ভারতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী বিনিয়োগ, ব্যক্তিগত খরচ, গ্রামীণ চাহিদা এবং শিল্পক্ষেত্রের ভালো পারফরম্যান্স। আর সেই কারণেই বিশ্ব ব্যাঙ্ক ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের GDP Growth-এর পূর্বাভাস ৬.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.১ শতাংশ করেছে। তবে সামনে রয়েছে তেলের দাম, মুদ্রাস্ফীতি এবং El Nino-র মতো ঝুঁকি।
