পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক মানচিত্রকে পুরোপুরি বদলে দিতে এবং রাজ্যে বড় মাপের শিল্প ও কর্মসংস্থানের জোয়ার আনতে এবার সরাসরি ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর দরবারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও শিল্পবিমুখতার তকমা মুছে ফেলে বাংলাকে বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু করে তুলতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ে। আর সেখানেই রিল্যায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান তথা এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির সঙ্গে তাঁর এক অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও দূরদর্শী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। শুধু ভারী শিল্প বা তথ্যপ্রযুক্তিই নয়— বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পশু চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া গুজরাটের জামনগরের বিখ্যাত ‘বনতারা’ প্রকল্পের একটি বিশেষ শাখা বাংলায় চালু করার প্রস্তাব উঠে এসেছে এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে!
মঙ্গলবার সকালে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। গণেশোৎসবের আবহে মুম্বইয়ের আম্বানি আবাসে গিয়ে তিনি সিদ্ধিদাতা গণেশের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। সনাতনী সংস্কৃতির মেলবন্ধনে বাংলার পক্ষ থেকে মুকেশ আম্বানির হাতে পরম শ্রদ্ধায় তুলে দেওয়া হয় মা ভবতারিণীর এক অপরূপ বিগ্রহ। তবে এই সাক্ষাৎ কেবল সৌজন্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ধর্মীয় আবহের পরেই দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হয় বাংলার ভবিষ্যৎ শিল্প সম্ভাবনা, লগ্নির পরিবেশ এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিয়ে।
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাজ্যের বিপুল যুবশক্তি এবং মেধার শক্তির কথা রিল্যায়েন্স কর্ণধারের সামনে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান— পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে। শিল্পপতিদের জন্য কোনো কাটমানি বা প্রশাসনিক লাল ফিতের ফাঁসের দিন শেষ। রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো বড় শিল্প প্রকল্প সফল করার পরিকাঠামো এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। সূত্রের খবর, বাংলায় একাধিক ক্ষেত্রে বড়সড় নতুন পুঁজি বিনিয়োগ করতে রিল্যায়েন্স গোষ্ঠীও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে বৈঠকের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও সংবেদনশীল দিকটি হলো— পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। পশুপ্রেমী হিসেবে অনন্ত আম্বানির নেতৃত্বে গুজরাটে গড়ে ওঠা ‘বনতারা’ আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সেই প্রকল্পের আদলে পশ্চিমবঙ্গে একটি ‘মিনি বনতারা’ তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। ডুয়ার্স ও সুন্দরবনের সমৃদ্ধ বনাঞ্চল থাকা এই রাজ্যে যদি এমন আধুনিক পশু চিকিৎসা কেন্দ্র ও অভয়ারণ্য গড়ে ওঠে, তবে তা শুধু পশু সুরক্ষাই নয়, পরিবেশ পর্যটনেও খুলে দেবে নতুন দিগন্ত।
অতীতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের নামে নিছক ফাঁকা প্রতিশ্রুতির যে ছবি দেখা যেত, সেই প্রথা ভেঙে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বিনিয়োগকারীদের টেবিলে বসে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পেশ করছেন। রিল্যায়েন্সের এই সম্ভাব্য মেগা প্রকল্প ও বিনিয়োগ বাংলায় বাস্তবায়িত হলে যে হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থানের স্থায়ী পথ তৈরি হবে, তা বলাই বাহুল্য। মুম্বইয়ের এই বৈঠকের পর এখন গোটা রাজ্য তাকিয়ে রয়েছে বাংলার মাটিতে রিল্যায়েন্সের সেই নতুন শিল্প দিগন্তের সূচনার দিকে!