ভোটের বৈতরণী পার করতে বাংলার মহিলাদের মাসে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঢালাও আশ্বাস দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বা বড় বড় বিজ্ঞাপনী প্রতিশ্রুতি ছড়িয়ে দেওয়ার পর সেই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ যে আদতে এক বিশাল প্রতারণা এবং নির্বাচনী স্টান্ট, তা এবার হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে গেল। মাসের পর মাস কেটে গেলেও সাধারণ ও যোগ্য মহিলাদের ব্যাংকে কোনো টাকা ঢোকেনি। বিজেপির এই চরম ভাওতাবাজি ও চালবাজির বিরুদ্ধে এবার নিজেদের দলের মহিলারাই খেপে উঠেছেন। হুগলির পোলবায় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ রূপ নেয় যে, টাকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ বিজেপির নারী কর্মীরাই পঞ্চায়েত দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেন! বিজেপির মিথ্যা আশ্বাসের ফানুস এভাবে নিজেদের ঘরেই সশব্দে ফেটে যাওয়ায় এখন চরম অস্বস্তিতে পড়েছে রাজ্য গেরুয়া নেতৃত্ব।
শুধু পোলবাতেই শেষ নয়, বিজেপির এই জুমলা নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে মালদহ, নদিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া এবং কোচবিহারেও। আবেদন জানানোর পর চার-পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও প্রতারিত মহিলারা অ্যাকাউন্টে কোনো অর্থ পাননি। নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ থেকে শুরু করে দিনহাটা, পুণ্ডিবাড়ি, মাথাভাঙা—সব জায়গায় মহিলারা আর বিজেপির কথা না শুনে রাজপথে নেমে এসেছেন। কোথাও বিডিও দপ্তর ঘেরাও হচ্ছে, কোথাও রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানো হচ্ছে, আবার কোথাও এসডিও অফিসের সামনে দিনভর ধরনায় বসতে বাধ্য হচ্ছেন প্রতারিত নারীরা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরে অন্নপূর্ণা যোজনার নামে জালিয়াতির বিরুদ্ধে মহিলারা রাজ্য সড়ক স্তব্ধ করে দিলে তোলপাড় শুরু হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা সোজা পুরসভার ভেতরে ঢুকে পড়েন। অন্যদিকে হাওড়ার পাঁচলা এবং উদয়নারায়ণপুরেও পথ অবরোধ করে বিজেপি সরকারের প্রতারণামূলক নীতির বিরুদ্ধে ধিক্কার জানানো হয়। কোচবিহার-শিলিগুড়ি সড়ক থেকে শুরু করে মাথাভাঙা-ময়নাগুড়ি রাজ্য সড়কে দূরপাল্লার গাড়ি আটকে যায় ক্ষুব্ধ উপভোক্তাদের প্রতিবাদে। বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, ভোটের আগে বড় বড় কথা বলে ফর্ম তো তোলা হলো, কিন্তু এখন মাসের পর মাস ঘোরানো হচ্ছে আর মিথ্যা অজুহাত দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্নপূর্ণা যোজনা আসলে বিজেপির একটি কাটছাঁট করা ও ভুয়া নির্বাচনী ফন্দি ছাড়া কিছুই নয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ‘অন্নপূর্ণা দিবস’ পালন করে কোটি কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা পাঠানোর যে ঢাকঢোল বিজেপি পিটিয়েছিল, বাস্তব জমিতে তা যে কত বড় অসত্য ও ভুয়ো দাবি, জেলায় জেলায় তালা ঝুলানো ও সড়ক অবরোধের চিত্রই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে বাংলার মা-বোনেদের আবেগ নিয়ে এভাবে খেলা করা বিজেপির পুরনো অভ্যাস। কিন্তু এবার বিজেপিরই নারী কর্মী ও সমর্থকেরা তাঁদের পঞ্চায়েতে তালা লাগিয়ে ও রাস্তায় বসে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে দিলেন—ভাঁওতাবাজি আর চালবাজির দিন শেষ, বিজেপি সরকারের প্রতারণা বাংলার মানুষ আর মুখ বুজে সহ্য করবে না।
