“বিশ্বাস ব্রাদার্স জমানা শেষ, এবার চালাকি করলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না!”ভোট বুথের বাইরে দাঁড়িয়ে মিঠুন চক্রবর্তীর চরম হুঁশিয়ারি !

দীর্ঘ কয়েক দশকের একচ্ছত্র আধিপত্য, ভয় দেখানো আর অলিখিত ‘ব্যান কালচার’-এর অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলল টালিগঞ্জ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি! অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাস অর্থাৎ টলিপাড়ার বিতর্কিত ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর একনায়কতন্ত্রের পতনের পর এই প্রথমবার সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আয়োজিত হচ্ছে ফেডারেশন অফ ওল্ড অ্যান্ড নিউ টেকনিশিয়ান্স-এর নির্বাচন। শনিবার ৩১ অক্টোবর এবং রবিবার ১ নভেম্বর— দু’দিন ধরে চলা এই ভোটপর্বকে ঘিরে সকাল থেকেই টানটান উত্তেজনা টেকনিশিয়ান্স থেকে শুরু করে ইন্দ্রপুরী স্টুডিও জুড়ে। লালবাজারের কড়া পুলিশি নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোট উৎসব যেন টলিউডের অন্ধকার অধ্যায় কাটিয়ে এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট পরিচালনা করতে বন্ধ রাখা হয়েছে টলিপাড়ার সিংহভাগ শুটিং। টেকনিশিয়ান স্টুডিও, এনটি ওয়ান, ইন্দ্রপুরী এবং ভারতলক্ষ্মী স্টুডিও— এই ৪টি প্রধান কেন্দ্রকে ঢেলে সাজানো হয়েছে ভোটকেন্দ্র হিসেবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ভোটার তালিকায়। বিগত জমানায় থাকা প্রায় আট হাজার ভোটারের তালিকা স্ক্রিনিং বা যাচাই করে বাদ দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার ভুতুড়ে ও নিষ্ক্রিয় সদস্যকে। বর্তমানে চূড়ান্ত সংশোধিত তালিকায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন ৪,১১০ জন সদস্য। যার মধ্যে প্রথম দিন ভোট দিয়েছেন ২,৪১০ জন এবং দ্বিতীয় দিন রবিবারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ১,৭০০ জন প্রকৃত টেকনিশিয়ান।

টলিউডের মোট ২৩টি গিল্ডের সমীকরণও এবার বেশ চমকপ্রদ। ডিরেক্টরস গিল্ড, ডান্সার, লাইট অপারেটর্স, ড্রাইভার্স ও মিউজিশিয়ানস সহ মোট ৭টি গিল্ডে প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়যুক্ত হয়েছেন। বাকি ১৬টি গিল্ডের মধ্যে প্রথম দিন নির্বাচন হয়েছে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ গিল্ডে। যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল মেকআপ আর্টিস্ট গিল্ড। কারণ অতীতে এই গিল্ডের এক সদস্য কাজ না পেয়ে অভিমানে গায়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে এক মেকআপ আর্টিস্টের দায়ের করা দুর্নীতির অভিযোগেই শ্রীঘরে যেতে হয় তৎকালীন প্রভাবশালী ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসকে। স্বরূপের পর ফেডারেশনের মূল হার্ড ডিস্ক বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে থাকায়, কোনো একক ব্যক্তির অঙ্গুলিহেলনে নয়— নিরপেক্ষ একটি স্টপগ্যাপ কমিটির তত্ত্বাবধানেই চলছে গোটা নির্বাচন।

তবে প্রথম দিনের ভোটপর্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন স্বয়ং মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী ও অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। নিজে ভোটার না হওয়ায় নির্বাচনী বিধি মেনে টেকনিশিয়ান স্টুডিওর ভোটকেন্দ্রের বাইরে শান্ত হয়ে বসেছিলেন মিঠুন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি। চাঁচাছোলা ভাষায় মিঠুন বলেন— “বিগত জমানায় যা চলেছে তা কোনো সংগঠন ছিল না, তা ছিল একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারী শাসন। তথাকথিত ব্যান কালচারের নামে টেকনিশিয়ান, সাধারণ শিল্পী ও প্রযোজকদের জীবন ওষ্ঠাগত করে তোলা হয়েছিল।”

এরপরই নিজের সেই চেনা উত্তর কলকাতার মেজাজে ফিরে গিয়ে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন— “আমি উত্তর কলকাতার এক নম্বর দু নম্বরী লোক ছিলাম। এবার যদি কেউ ভোটের ভেতর চালাকি বা কোনো বদমাইশি করার চেষ্টা করে, তবে আমার চেয়ে খারাপ লোক আর কেউ হবে না! গণতন্ত্র আর সংবিধানের ওপর ভরসা রেখেই আজ নতুন পথ চলা শুরু হলো।” একই সাথে আগামী ৬ মাসের মধ্যে টলিপাড়ার চেহারা আমূল বদলে যাওয়ার আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাজ্য সরকারের ৩০ শতাংশ সাবসিডির সুবিধা পেলে বহিরাগত প্রযোজকরা বিপুল সংখ্যায় বাংলায় সিনেমা তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

রবিবার বাকি ১১টি গিল্ডের ভোট শেষ হলেই ঘোষিত হবে চূড়ান্ত ফলাফল। পুরোনো সিন্ডিকেট রাজের অবসান ঘটিয়ে কোন যোগ্য ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের হাতে টলিপাড়ার পরিচালনার চাবিকাঠি উঠতে চলেছে— এখন সেদিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে গোটা বিনোদন জগৎ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *