স্বাস্থ্য দপ্তরের বাজেট আলোচনা ঘিরে সোমবার বিধানসভায় এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব থাকা বিজেপি শিবিরের এক মন্ত্রীর বক্তব্যেই উঠে এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির একাধিক পরিসংখ্যান। বিশেষ করে মাতৃমৃত্যুর হার কমার তথ্য বিধানসভার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাজেট আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে মাতৃমৃত্যুর হার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৯ সময়কালে যেখানে প্রতি লক্ষ জীবিত প্রসবে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১০৯, সেখানে ২০২২-২৪ সময়পর্বে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৪-এ। এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই বিরোধী ও শাসক—উভয় রাজনৈতিক শিবিরেই শুরু হয় নতুন আলোচনা।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী মহিলাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তৃণমূল স্তরে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ফলে এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে আশা কর্মীদের মাধ্যমে গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা মাতৃমৃত্যু কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেই তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি প্রসবের আগে ও পরে স্বাস্থ্যগত জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথাও তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ডিজিটাল পরিকাঠামো নিয়েও বাজেট আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা (PMMVY) 2.0’-এর আওতায় জেলা থেকে ব্লক এবং সেক্টর স্তর পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরিষেবাকে ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সুবিধাভোগীদের নথিভুক্তিকরণ, স্বাস্থ্য পরিষেবার পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কাজ আরও সহজ হয়েছে।
বাজেটে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫.৯ লক্ষের বেশি উপভোক্তা সুবিধা পেয়েছেন। প্রকল্প চালুর পর থেকে মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৫ লক্ষে পৌঁছেছে বলেও জানানো হয়। গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে নিবন্ধন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী ফলো-আপ—এই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করার ফলেই মাতৃস্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা হয়।
বিধানসভার এই আলোচনা রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে সমালোচনার পর এদিন সরকারি নথিভুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে উন্নতির চিত্র তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে মাতৃমৃত্যুর হার কমার পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ নিয়ে উপস্থাপিত তথ্য রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, স্বাস্থ্য দপ্তরের বাজেট অধিবেশনে উপস্থাপিত এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র প্রশাসনিক সাফল্যের দাবি নয়, রাজনৈতিক আলোচনারও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিজেপির স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখে রাজ্যের স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতির তথ্য উঠে আসায় বিধানসভার এই আলোচনা এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চিত বিষয়।sharadwat mukherjee