সোশ্যাল মিডিয়ার ডিজিটাল দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অপব্যবহার যে কতটা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে, তার আরও এক ভয়াবহ প্রমাণ মিলল এবার খোদ দেশের জাতীয় সুরক্ষাকে ঘিরে! চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নাকি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ অরুণাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে— এমন চাঞ্চল্যকর ও বিভ্রান্তিকর দাবি সংবলিত ভারতীয় সেনার এক শীর্ষ কম্যান্ডারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল তীব্র আলোড়ন। কিন্তু সেই বিষাক্ত প্রোপাগান্ডা আর বিভ্রান্তির জাল নিমেষের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দিল ভারতীয় সেনা। সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ফ্যাক্ট চেক ইউনিট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে— ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়ো, বানোয়াট এবং আধুনিক এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা মারাত্মক এক ‘ডিপফেক’ ভিডিও!
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদাধিকারী লেফটেনেন্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়ার ছবি ও দৃশ্য ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম অডিও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ভুয়ো দাবি করা হয়— চিন নাকি অরুণাচল প্রদেশের আসাফিলা, লংজু এবং টাকসিং সার্কেল সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছে এবং সীমান্তে মোতায়েন ভারতীয় জওয়ানদের প্রয়োজনীয় রসদ ও সরবরাহ থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। এমন জাতীয় নিরাপত্তা বিরোধী বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেশজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করাই ছিল এই ডিজিটাল চক্রান্তের মূল উদ্দেশ্য।
কিন্তু সেনাবাহিনীর ফ্যাক্ট চেক ইউনিট সেই ভিডিওর চুলচেরা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে আসল সত্যিটা জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। জানা গিয়েছে, ভিডিওটির মূল ফুটেজটি ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর জম্মু ও কাশ্মীরের কুপওয়াড়ায় তোলা হয়েছিল। সেই সময় তৎকালীন মেজর জেনারেল গিরিশ কালিয়া ২৮ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসিতে ভারতীয় সেনার সফল অনুপ্রবেশ বিরোধী অভিযান নিয়ে একটি সরকারি সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন। সেই আসল ব্রিফিংয়ে তিনি জানিয়েছিলেন— গত আট মাসে ১০টি অনুপ্রবেশের চেষ্টা সফলভাবে ভেস্তে দেওয়া হয়েছে, ২৭ জন পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিকে খতম করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করেছে সেনা। সেখানে অরুণাচল প্রদেশ বা চিনের আগ্রাসন সংক্রান্ত কোনো দূরবর্তী উল্লেখও ছিল না। অথচ সেই প্রেস কনফারেন্সের পুরনো ফুটেজটি কেটে তার ওপর কৃত্রিম কণ্ঠস্বর বা সিন্থেটিক জেনারেটেড ভয়েস বসিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা এক আঞ্চলিক দাবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে লেফটেনেন্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্পিয়ার কর্পস’-এর জিওসি হিসেবে দেশের সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর মতো দায়িত্বশীল সেনা কর্তার নাম ও ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাইবার হামলা চালানোয় অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও ভারতীয় সেনা। একাধিক স্বাধীন ফ্যাক্ট চেক সংস্থাও অডিও স্পেকট্রোগ্রাম বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে, ভিডিওর ভয়েস ট্র্যাকটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ও সামরিক বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে এই ধরনের ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন ও ডিপফেক প্রোপাগান্ডা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেশবাসীকে কড়া বার্তা দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে— কোনো সোশ্যাল মিডিয়া বা হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখেই যেন অন্ধের মতো বিশ্বাস না করা হয়। জাতীয় সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো বিভ্রান্তিকর পোস্ট শেয়ার করাও দেশের নিরাপত্তার জন্য চরম ক্ষতিকর। তাই যেকোনো সংবেদনশীল খবর বিশ্বাস বা ফরোয়ার্ড করার আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ফ্যাক্ট চেক প্ল্যাটফর্ম বা নির্ভরযোগ্য সরকারি মাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়াই প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের প্রধান কর্তব্য!
