চোরবাগানের ক্ষত এখনও টাটকা! এবছর কালীঘাটে বিজয়া উদযাপনে ‘না’ মমতার, মিষ্টিমুখও হবে না দলের কর্মীদের সঙ্গে।

দুর্গাপুজোর উৎসব শেষ হলেও চোরবাগানের ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষত এখনও টাটকা। আর সেই কারণেই এবছর কালীঘাটে বিজয়া উদযাপন থেকে বিরত থাকছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতি বছর বিজয়া দশমী উপলক্ষে কালীঘাটের বাড়িতে দলের নেতা-কর্মীদের ভিড় দেখা যায়। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি চলে মিষ্টিমুখ এবং সৌজন্য সাক্ষাৎ। কিন্তু এবার সেই পরিচিত ছবিতে বড় বদল।

দলের কর্মীদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ, বিজয়ার দিনে তাঁরা আসবেন, শুভেচ্ছা জানাবেন, তবে কোনও ধরনের মিষ্টিমুখ বা বড়সড় উদযাপন হবে না। উৎসবের পরিবেশ থাকলেও এবার কোনও হইচই নয়—এমনটাই সিদ্ধান্ত বলে জানা গিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। গত ১৭ অক্টোবর, সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বৃষ্টি এবং বিপুল ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় ১৯ জনের। পুজোর আনন্দের মধ্যেই এই ঘটনা গোটা রাজ্যকে শোকস্তব্ধ করে দেয়।

দুর্ঘটনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শোকপ্রকাশ করেন। প্রশাসনের তরফেও পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তদন্তও চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বিজয়ার মতো উৎসবের দিনেও বড় করে কোনও আয়োজন করতে চাইছেন না দলনেত্রী।

প্রতি বছর দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর তৃণমূলের তরফে দীর্ঘ সময় ধরে বিজয়া সম্মিলনী এবং জনসংযোগ কর্মসূচি চলত। কালীঘাটের বাড়ি থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন দলীয় কার্যালয় এবং স্থানীয় স্তরে নেতা-কর্মীরা মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। কোথাও কোথাও থাকত খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও।

কিন্তু এবার সেই কর্মসূচির ছবিতেও এসেছে বদল। চোরবাগানের ঘটনার পাশাপাশি রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কথাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। নতুন সরকার গঠনের পর দলের বেশ কিছু কর্মী-সমর্থক সমস্যায় রয়েছেন বলেও তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তা এবং পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

ফলে এবারের বিজয়া দশমীতে উৎসবের বদলে সংযত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মীরা কালীঘাটে এসে নেত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবেন, কিন্তু মিষ্টিমুখ বা বড়সড় উদযাপনের আয়োজন থাকবে না।

চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর থেকেই মানুষের মধ্যে শোকের আবহ রয়েছে। বিজয়ার উৎসবের মধ্যেও সেই ঘটনার স্মৃতি বারবার সামনে এসেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ১৯ জনের পরিবার এবং আহতদের পরিস্থিতি ঘিরে এখনও উদ্বেগ রয়েছে।

এই আবহেই কালীঘাটের বিজয়া উদযাপন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উৎসবের দিন হলেও আনন্দের আনুষ্ঠানিকতা থেকে দূরে থেকে শোকাহত পরিস্থিতির প্রতি সম্মান জানানোর বার্তাই এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।

অর্থাৎ অন্যান্য বছরের মতো এবার কালীঘাটে দেখা যাবে না বড় আয়োজন। থাকবে না মিষ্টিমুখের পর্বও। থাকবে শুধু শুভেচ্ছা বিনিময় এবং চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি—যার ছায়া এবারের বিজয়ার আনন্দকেও অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

তাই এবারের বিজয়া কালীঘাটে উৎসবের চেনা ছবি নয়, বরং সংযম আর শোকের আবহেই কাটবে—চোরবাগানের ১৯টি প্রাণের স্মৃতিই যেন ছাপিয়ে গেল বিজয়ার আনন্দকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *