সিনেমা ও শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান, কলকাতার স্বনামধন্য সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট বা এসআরএফটিআই চত্বর এবার পরিণত হলো এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্রে! রবিবার ছুটির দিনে এক চরম অশান্তি, হিংসা ও বিশৃঙ্খলার সাক্ষী থাকল এই জাতীয় স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্যাম্পাসের ভেতরে আরএসএস অনুমোদিত সর্বভারতীয় সংগঠন ‘নিখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর পূর্বনির্ধারিত একটি আলোচনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একদল বামপন্থী মনোভাবাপন্ন ছাত্রের নজিরবিহীন সংঘর্ষের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগাম আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়েই ক্যাম্পাসের মিলনায়তনে ওই কর্মসূচি চলছিল। কিন্তু অভিযোগ— অনুষ্ঠান চলাকালীন হঠাৎ করেই একদল পড়ুয়া জোর করে সভাগৃহে ঢুকে পড়ে চরম তাণ্ডব শুরু করে। শুধু অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করাই নয়, মঞ্চে থাকা সংগঠনের পতাকা টেনে ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এই চরম ধৃষ্টতার প্রতিবাদ জানাতেই দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় সর্বাত্মক মারামারি ও রক্তক্ষয়ী হাতাহাতিতে।
খবর পেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিসি অরিন্দম সরকারের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী ক্যাম্পাসে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায়। খোদ পুলিশ বাহিনীর চোখের সামনেই দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার নেয় যে, ছাত্রদের উন্মত্ত বিক্ষোভের মুখে পড়ে নিগৃহীত হতে হয় খোদ প্রতিষ্ঠানের একাধিক অধ্যাপককে! অধ্যাপকদের একটি কক্ষে জোর করে আটকে রেখে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে উন্মত্ত পড়ুয়ারা। তাদের দাবি— আরএসএস-এর মতো কোনো জাতীয়তাবাদী শাখা সংগঠনকে কেন ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ভেতরে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হলো? এমনকি ক্যাম্পাসে দেশবিরোধী ও পাকিস্তান সংক্রান্ত স্লোগান দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও তোলে ছাত্ররা।
পরিস্থিতি জটিল হতে দেখে শেষপর্যন্ত অধ্যাপকদের ঘেরাওমুক্ত করতে ক্যাম্পাসের অন্দরে প্রবেশ করে পুলিশ। এদিকে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ক্যাম্পাসের প্রধান প্রবেশদ্বার আটকে দেয় বিক্ষোভকারী ছাত্ররা। অনুষ্ঠান শেষে সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বের হতে যাওয়া একটি আস্ত যাত্রীবাহী বাস প্রায় চার ঘণ্টা ধরে গেটে আটকে রাখা হয়। গেটের বাইরে এবং ভেতর থেকে উড়ে আসতে থাকে ভাঙা কাঁচের টুকরো, ইট-পাটকেল ও জলের বোতল। এই অতর্কিত হিংসার ঘটনায় অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর মিলেছে।
ঘণ্টা চারেক পর পুলিশের হস্তক্ষেপে বাসটিকে ক্যাম্পাস থেকে বের করা সম্ভব হলেও উত্তেজনা একবিন্দু কমেনি। ক্যাম্পাসের বাইরে ইটবৃষ্টি ও ধস্তাধস্তির জেরে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স। যে ক্যাম্পাসে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক ব্যাকরণ আর সুস্থ ভাবনার বিকাশ ঘটার কথা, সেখানে গণতান্ত্রিক আলোচনার মঞ্চ ভেঙে পতাকা ছিঁড়ে ফেলার এই উগ্র অসহিষ্ণুতা আবারও শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন তুলে দিল!