রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক কড়াকড়িতে রাজ্যে গোহত্যা ও গরু পাচারের বাড়বাড়ন্ত অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে ঠিকই, কিন্তু পাচারকারীদের সেই অন্ধকার চক্র এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি! সম্প্রতি পুরুলিয়ার মতো জেলায় বিলাসবহুল এসইউভি বা দামি চারচাকা গাড়ির ভেতরে গরু পুরে অভিনব কায়দায় পাচারের চেষ্টা সেই চরম বাস্তবকেই ফের সামনে এনে দিয়েছে। পুলিশি তৎপরতায় অভিযুক্তরা হাতেনাতে পাকড়াও হলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার চূড়ান্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা ভিএইচপি। সীমান্ত ও গ্রামবাংলায় গরু পাচার ও বেআইনি গোহত্যাকে সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনতে দিল্লির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তৈরি হলো এক সুনির্দিষ্ট ও নিশ্ছিদ্র ‘নীল নকশা’!
জাতীয় রাজধানীতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে আয়োজিত এই মেগা স্ট্র্যাটেজি বৈঠকে খোদ ভিএইচপির আন্তর্জাতিক সভাপতি অলোক কুমার সরাসরি মুখোমুখি বসেছিলেন ‘রাষ্ট্রীয় গোরক্ষা বাহিনী গোসেবা সংঘ’-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার শীর্ষ নেতৃত্বদের সঙ্গে। ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রধান যেভাবে রাজ্যের একটি নির্দিষ্ট গোরক্ষা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সাথে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করে কর্মপদ্ধতি চূড়ান্ত করলেন, তা রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। সূত্রের খবর— খুব শীঘ্রই বাংলার প্রতিটি প্রান্তে বিশেষ গোরক্ষক দল মোতায়েন করতে চলেছে সংগঠনটি, যারা স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে নজরদারি চালাবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত কর্মসূচির দিনক্ষণ ঘোষণা করা না হলেও, সাংগঠনিক সূত্রে স্পষ্ট জানা গিয়েছে— খুব দ্রুত রাজ্যের প্রতিটি জেলায় যৌথ ‘গোসেবা’ কর্মসূচি শুরু হতে চলেছে। বিশেষ করে সীমান্ত ঘেঁষা সংবেদনশীল জেলা এবং পাচারের প্রধান করিডোর হিসেবে পরিচিত উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোরদার সচেতনতামূলক প্রচার এবং পাচারবিরোধী অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা গোশালাগুলিকে অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে গো-সম্পদ রক্ষার স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
তবে দিল্লির এই বৈঠকের সবচেয়ে নজরকাড়া ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল মঞ্চে সংখ্যালঘু নেতৃত্বের বলিষ্ঠ উপস্থিতি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রীয় গোরক্ষা বাহিনী গোসেবা সংঘের সংখ্যালঘু সেলের জাতীয় সভাপতি ইকবাল ত্যাগী এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সংখ্যালঘু সেলের সভাপতি রিজওয়ান আনসারি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এর মাধ্যমে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে— গো-রক্ষা বা গরু পাচার রোধ কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় সংঘাতের বিষয় নয়, এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের দাবিও নয়; বরং যেকোনো বেআইনি পাচার ও অবলা পশুর ওপর নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে সব ধর্মের মানুষের একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
দিল্লির এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বঙ্গ নেতৃত্বের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের ‘গোমাতা স্মারক’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক বাবান ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পর্যবেক্ষক বিক্রম ঘোষ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সভাপতি প্রসেনজিৎ দে এবং উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সভাপতি স্বামী ঈশ্বরানন্দ প্রভুজি মহারাজ।
পুরুলিয়া থেকে ২৪ পরগনা— বাংলায় পাচারচক্রের শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে এবার যে মাঠের লড়াইয়ে কোমর বেঁধে নামছে হিন্দু সংগঠনগুলি, দিল্লির এই মেগা বৈঠকের পর সেই সঙ্কেতই স্পষ্ট হয়ে উঠল!