নির্বাচনে হারলেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা এবং কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই ভোট চুরির মনগড়া অভিযোগ তোলা— বিরোধীদের এই ধারাবাহিক অপকৌশলের বিরুদ্ধে এবার গর্জে উঠলেন দেশের ১২৪ জন প্রবীণ ও বিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত আমলা! শনিবার দিল্লিতে যখন বিরোধীদের তথাকথিত বিক্ষোভ মঞ্চে রাহুল গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতারা নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজপথ উত্তাল করার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই নির্বাচন কমিশনের পাশে পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন ১২৪ জন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস ও আইএফএস আধিকারিক। দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে লেখা এক ঐতিহাসিক খোলা চিঠিতে আমলারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন— “ভোট চুরির যে অভিযোগ বারবার তোলা হচ্ছে, তার স্বপক্ষে বাস্তব প্রমাণ কোথায়?”
নাগরিক সমাজের উদ্দেশে দেওয়া ওই চিঠিতে প্রাক্তন শীর্ষ আমলারা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন— নিছক রাজনৈতিক হতাশা ও সন্দেহের বশে ভারতের নির্বাচন কমিশনের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক স্তম্ভের বিরুদ্ধে এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা যায় না। চাকরিজীবনের দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নির্বাচন পরিচালনার সরাসরি অভিজ্ঞতা থাকা এই শীর্ষ আধিকারিকরা মনে করিয়ে দেন— ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে শুরু করে বুথের প্রস্তুতি, মক পোল, এবং ভোট শেষের পর স্ট্রং রুমের ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা— প্রতিটি ধাপ কীভাবে কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় পরিচালিত হয়, তা তাঁদের নখদর্পণে রয়েছে। কোনো রকম অকাট্য প্রমাণ ছাড়া বারবার ভোটে কারচুপি বা রিগিংয়ের মনগড়া দাবি তুললে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের মৌলিক আস্থা নষ্ট হয়, যা যেকোনো দেশের জন্য চরম বিপজ্জনক।
চিঠিতে আমলারা অত্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করে লেখেন— “আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই। কিন্তু যেভাবে তথ্যপ্রমাণ ছাড়া বারবার নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে, তাতে আমাদের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসে চরম আঘাত লাগছে।” তাঁরা বিরোধীদের অতীত ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন— ভারতীয় নির্বাচনে একসময় ব্যালট পেপারের যুগে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, হিংসা এবং ব্যালট বাক্স লুটের মতো নারকীয় ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় ছিল। প্রযুক্তি ও ইভিএম-এর মাধ্যমে সেই কালো দিনগুলি মুছে দিয়ে ভারতীয় নির্বাচন আজ আন্তর্জাতিক স্তরে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিরোধীদের অপপ্রচারের প্রতিটি যুক্তি খণ্ডন করে অবসরপ্রাপ্ত আমলারা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে— ভোটগ্রহণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি বুথে সমস্ত রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টরা সশরীরে উপস্থিত থাকেন। তাঁরা গোটা প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখেন, ভোট শেষ হলে ১৭সি ফর্মের মতো সংবেদনশীল নথিতে সই করে প্রাপ্ত ভোটের প্রতিলিপি সংগ্রহ করেন এবং পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতেই ইভিএম মেশিন সিল করা হয়। ফলে ভোট গণনায় কারচুপির কোনো প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক সুযোগই থাকে না।
এর পাশাপাশি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে— নির্বাচন কমিশন কোনো এক ব্যক্তির নির্দেশে চলে না। ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের ভিত্তিতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ তিনজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত কমিশন যৌথ ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাজ করে।
দিল্লির রাজপথে বিরোধীদের যখন নির্বাচন কমিশন ধ্বংসের রাজনীতি চলছিল, ঠিক তখনই ১২৪ জন প্রাক্তন আমলার এই তথ্যনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপ বিরোধীদের সাজানো বয়ানকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিল। দেশের অভিজ্ঞ প্রশাসনিক মস্তিষ্কদের এই বার্তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল— নির্বাচনে পরাজয়ের দায় ঢাকতে গিয়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত করার দিন শেষ, প্রমাণহীন অভিযোগকে সচেতন দেশবাসী আর কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না!
