ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সমীকরণের বদল তার আঁচ কি পড়ল পুজোর বইয়ের বাজারেও? দুর্গাপুজোর মণ্ডপে যখন উপচে পড়েছে দর্শনার্থীদের ভিড়, তখন বুক স্টল ঘিরেও সামনে এল চমকে দেওয়ার মতো হিসাব। বিজেপির দাবি, তাদের বুক স্টল থেকে বিক্রি হয়েছে ২ কোটি টাকারও বেশি বই। অন্যদিকে, বামেদের বুক স্টলেও বই কেনার আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে যাদবপুরে CPM-এর বইয়ের দোকানে গত বছরের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে প্রায় চার গুণ! মোদি থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আরএসএসের ইতিহাস থেকে রামমন্দির আন্দোলন কোন বইয়ের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন পাঠকরা? পুজোর বইয়ের বাজারে কি শুধুই রাজনৈতিক প্রচার, নাকি মতাদর্শ জানার আগ্রহও বাড়ছে? বিক্রির এই পরিসংখ্যান ঘিরে এখন নজর দুই শিবিরের দিকেই।
রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর এ বারই প্রথম দুর্গাপুজো। আর সেই পুজোকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে বিজেপি ও গেরুয়া শিবিরের বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় ২,৫০০টি বুক স্টল তৈরি করা হয়েছিল। কলকাতা পুর এলাকার মধ্যেই ছিল ২০০-র বেশি স্টল। বিজেপির রাজ্য সহ-সভাপতি অমিতাভ রায়ের দাবি, দলের ৪০টি সাংগঠনিক জেলার প্রতিটিতে প্রায় ২ থেকে আড়াই লক্ষ টাকার বই বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি স্টলগুলির বিক্রি ধরলে মোট অঙ্ক ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
তবে শুধু বিক্রির অঙ্ক নয়, কোন ধরনের বইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি ছিল, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিজেপির বুক স্টলে এ বার বিশেষ চাহিদা ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে লেখা বইয়ের। প্রশাসক হিসেবে তাঁর ২৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা বই রাখা হয়েছিল পাঠকদের জন্য। পাশাপাশি জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং কাশ্মীর নিয়ে তাঁর ভূমিকা সংক্রান্ত বইও বিক্রি হয়েছে বলে দলের তরফে জানানো হয়েছে।
বিজেপির সাহিত্য ইনচার্জ সপ্তর্ষি চৌধুরীর বক্তব্য, মোদি ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা বইয়ের পাশাপাশি দলের বিভিন্ন পত্রপত্রিকারও ভালো চাহিদা ছিল। আরএসএসের ইতিহাস, তাদের কাজের ধরন, হিন্দুত্ববাদ, বিজেপির উত্থান এবং দলের বিভিন্ন নেতার আত্মজীবনী নিয়েও বই রাখা হয়েছিল স্টলগুলিতে। রামমন্দির-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা বইও ছিল এই তালিকায়। অর্থাৎ, পুজোর বুক স্টলে শুধুই জনপ্রিয় নেতাদের জীবনী নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আন্দোলনের ইতিহাসও জায়গা করে নিয়েছিল।
এ বার আরও একটি বিষয়কে সামনে এনেছে বিজেপি। রাজ্যে সরকার গঠনের পর প্রথম পাঁচ মাসে কী কী কাজ হয়েছে, তা তুলে ধরে বিশেষ পুস্তিকা তৈরি করেছিল দল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও সাফল্যের কথাও তুলে ধরা হয় আলাদা পুস্তিকায়। পুজো দেখতে আসা মানুষকে সেগুলি বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দলের দাবি, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বিবরণ দেওয়া এই পুস্তিকাগুলির প্রতিও মানুষের আগ্রহ ছিল।
বুক স্টলগুলিতে ঘুরে দেখেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। টালা বারোয়ারির পুজো প্রাঙ্গণে সপ্তর্ষি চৌধুরীর উদ্যোগে তৈরি বুক স্টলেও যান তিনি। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এ বার শুধু দলের কর্মী-সমর্থকরাই নন, সাধারণ মানুষ এবং যুব সমাজের মধ্যেও বই কেনার আগ্রহ চোখে পড়েছে। গত বছর পুজোর সময় জেলা পিছু যেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছিল বলে দলের সূত্রে খবর, সেখানে এ বার বিক্রির অঙ্ক অনেকটাই বেড়েছে।
অন্যদিকে, বামেদের বুক স্টল ঘিরেও সামনে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান। বিশেষ করে যাদবপুরে CPM-এর বইয়ের দোকানে গত বছরের তুলনায় প্রায় চার গুণ বিক্রি বেড়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে একদিকে বিজেপির ২ কোটি টাকার বেশি বই বিক্রির দাবি, অন্যদিকে যাদবপুরে বামেদের বই বিক্রিতে বড়সড় বৃদ্ধি ।পুজোর বাজারে দুই রাজনৈতিক শিবিরের বুক স্টলই আলোচনায় উঠে এসেছে।
তবে এই বিক্রির হিসাব দিয়ে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সরাসরি বিচার করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, বই কেনার আগ্রহ আর ভোটের সমর্থন এক বিষয় নয়। তবু পুজোর মতো উৎসবের আবহে রাজনৈতিক বইয়ের চাহিদা এবং বুক স্টল ঘিরে মানুষের আগ্রহ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।