পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই। এখানে ভোট মানেই শুধু অঙ্ক নয়… আবেগ, অনুভূতি, ক্ষোভ আর প্রত্যাশার মিশেল। আর সেই কারণেই, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। ২৩ এপ্রিল উত্তরবঙ্গ এবং রাঢ়বঙ্গে ভোট। ২৯ এপ্রিল ভোট দক্ষিণবঙ্গে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাস্তায় নাকা চেকিং, কেন্দ্রীয় বাহিনী, জওয়ান আর সাঁজোয়া গাড়ির নজরদারি। প্রশ্ন একটাই, চতুর্থবার কি নবান্নে ফিরবে তৃণমূল? নাকি বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতায় আসবে বিজেপি?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত সমীক্ষা কিন্তু ইঙ্গিত দিচ্ছে একেবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের। সমীক্ষা বলছে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এখনও সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে। তবে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির উত্থানও চোখে পড়ার মতো। ফলে, ব্যবধান এতটাই কম যে শেষ মুহূর্তে কয়েক শতাংশ ভোটের হেরফেরেই বদলে যেতে পারে পুরো ছবি। ২৯৪ আসনের এই লড়াইয়ে কোনও দলই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ। সমীক্ষা অনুযায়ী, তৃণমূল একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসতে পারে। কিন্তু আগের তুলনায় তাদের আসন সংখ্যা কিছুটা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, বিজেপি গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের জন্য এই নির্বাচন বড় পরীক্ষা। নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, একের পর এক বিতর্ক। এই সমস্ত ইস্যুতে শাসক দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ভোটারদের একাংশের মধ্যে। সমীক্ষা বলছে, সেই ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’-র জেরে অনেকেই বিকল্প খুঁজছেন। তবে তৃণমূলের শক্তির জায়গাও রয়েছে। মহিলা ভোটারদের মধ্যে এখনও যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে শাসক দলের। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’-র মতো প্রকল্প তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মত সমীক্ষকদের।গ্রামবাংলার সংখ্যালঘু ভোটও তৃণমূলের অন্যতম বড় ভরসা।
অন্যদিকে, বিজেপি এখন আর বাংলার রাজনীতিতে শুধু বিরোধী দল নয়, বরং ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে অন্যতম প্রধান দাবিদার।সমীক্ষা অনুযায়ী, বিজেপির ভোট শতাংশ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের মেরুকরণ, আর মধ্যবিত্তের একাংশের ‘পরিবর্তন’-এর ইচ্ছাই বিজেপির পক্ষে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। সন্দেশখালির মতো ঘটনাও বিজেপির হাতে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিয়েছে। সমীক্ষায় তার প্রভাবও স্পষ্ট। এর পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রচার বিজেপির গ্রাফ আরও উপরে তুলছে।
এদিকে, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের অবস্থা এখনও খুব শক্তিশালী নয়। তবুও তারা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক নয়। কারণ, বাম-কংগ্রেস যদি কিছুটা ভোট বাড়াতে পারে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে। আর তাতে পরোক্ষভাবে লাভ হতে পারে বিজেপির। তরুণ ভোটারদের একাংশের মধ্যেও বামেদের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির কথা বলায়, নতুন প্রজন্মের কিছু ভোটার মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো বাম নেতাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষার ছবিটাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরবঙ্গে বিজেপি এখনও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। চা বাগান এলাকা এবং জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপির সমর্থন বেশি বলেই মত সমীক্ষকদের। জঙ্গলমহলে দুই দলের মধ্যে সমানে সমানে টক্কর।লোকসভায় বিজেপি এগিয়ে থাকলেও, বিধানসভায় তৃণমূল ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। এবারও সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে, দক্ষিণবঙ্গ এবং কলকাতা এখনও তৃণমূলের মূল ঘাঁটি। কলকাতা ও শহরতলিতে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বিজেপি। সমীক্ষা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে পাঁচটি বিষয় হতে পারে আসল গেম চেঞ্জার। এক— দুর্নীতি বনাম উন্নয়ন। তৃণমূলের উন্নয়নের দাবি বনাম বিজেপির দুর্নীতির অভিযোগ। দুই— কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা। ভোটাররা যদি নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, তাহলে বিজেপির লাভ হতে পারে। তিন— সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে সিএএ এবং এনআরসি ইস্যু। চার— ধর্মীয় মেরুকরণ। সমীক্ষা বলছে, হিন্দু এবং মুসলিম ভোটের বিভাজন এবারে আরও স্পষ্ট হতে পারে। আর পাঁচ— ফ্লোটিং ভোটার। প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত নেননি তাঁরা কাকে ভোট দেবেন। শেষ মুহূর্তে এই ভোটাররাই ঠিক করে দিতে পারেন বাংলার ভবিষ্যৎ।
তবে একটা কথা মনে রাখা জরুরি জনমত সমীক্ষা কখনওই চূড়ান্ত ফল নয়। কিন্তু তা বাতাসের গতিপ্রকৃতি বুঝিয়ে দেয়। আর সেই ইঙ্গিত বলছে, এবারের নির্বাচন গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে রুদ্ধশ্বাস হতে চলেছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের ‘গড় রক্ষার’ লড়াই। অন্যদিকে, মোদী-শাহের নেতৃত্বে বিজেপির ‘গড় দখলের’ মরিয়া চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষ কাকে বেছে নেবেন, তার উত্তর মিলবে ৪ মে ফলপ্রকাশের দিন। ততদিন পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে, এ কথা বলাই যায়।