যেখানে শারদোৎসব মানেই সর্বজনীন আনন্দ আর সম্প্রীতির বার্তা, সেখানে ওপার বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে ফের একবার প্রকাশ্যে এসে পড়ল কট্টর মৌলবাদী মানসিকতার নগ্ন রূপ! বাংলাদেশে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা এবং মণ্ডপগুলিতে আর্থিক অনুদান বৃদ্ধি পেতেই সহ্য করতে পারছে না কট্টরপন্থী সংগঠনগুলি। “মুসলিম প্রধান দেশে হিন্দুদের দুর্গাপূজায় কেন ছুটি দেওয়া হবে?”— এই সংকীর্ণ ও চরম সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন তুলে প্রকাশ্যে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেছে মৌলবাদী মঞ্চগুলি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট হলো, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে এবার দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ২০ থেকে ২৪শে অক্টোবর পর্যন্ত সব সরকারি দপ্তর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০ অক্টোবর মহানবমীতে নির্বাহী আদেশে ছুটি, ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর সাধারণ ছুটি এবং ২২ অক্টোবর অতিরিক্ত ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে এই পাঁচ দিনের অবকাশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি পূজা মণ্ডপে সরকারি অনুদান বাড়ানো এবং কড়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সনাতনীদের এই সামান্য উৎসবের অধিকারটুকুকেও মেনে নিতে পারছে না ওপার বাংলার এক শ্রেণির ধর্মান্ধ শক্তি। ‘ইনসাফ কায়েমকারী ছাত্র শ্রমিক জনতা’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম রীতিমতো রাস্তায় নেমে দাবি তুলেছে— মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে সাধারণ ছুটি দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই! তাদের ফতোয়া, হিন্দুদের উৎসবকে কেবল চার দেওয়ালের মণ্ডপের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এমনকি পরিবেশ দূষণ ও রাস্তা অবরোধের মতো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অজুহাত খাঁড়া করে প্রকাশ্য উদযাপন ও ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা বন্ধের অপচেষ্টা শুরু হয়েছে।
আর এই বিষাক্ত প্রচারের প্রভাব ইতিমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। উৎসবের কয়েক দিন আগেই বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে শুরু করেছে প্রতিমা ভাঙচুরের উদ্বেগজনক খবর। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে একটি ঐতিহাসিক মন্দিরে ঢুকে সাত-সাতটি প্রতিমা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত আর আশ্বাসের কথা বলা হলেও, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে বুক কাঁপছে ওপার বাংলার সংখ্যালঘু সনাতনী পরিবারের।
সংখ্যালঘু হিন্দু নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দুর্গাপূজা এই বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জনসংখ্যা কমে আসার সাথে সাথে ওপার বাংলায় হিন্দুদের অস্তিত্ব এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা বারবার এমন মৌলবাদী হুমকির মুখে এসে দাঁড়াচ্ছে। উৎসবের আবহেও প্রতিমা রক্ষার পাহারা আর মৌলবাদীদের রাজপথ কাঁপানো হুমকি ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল— ওপার বাংলায় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকারের লড়াই আজও কতটা কঠিন ও নির্মম!
