কলকাতার রাজনীতিতে এবং ইতিহাসের স্মৃতিচারণে নতুন অধ্যায় শুরু হল। পার্ক সার্কাস এলাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ-এর নাম বদলে এবার রাখা হচ্ছে গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড, যিনি সাধারণ মানুষের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে। এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কলকাতা পৌরনিগম। সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘প্রকৃত নায়কদের সম্মান জানানোর সময় এসেছে।’
১৯৩৩ সালে কলকাতা পৌরনিগম পার্ক সার্কাস থেকে কাশিপাড়া লেন পর্যন্ত নতুন নির্মিত ১০০ ফুট চওড়া রাস্তার নাম রাখে সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ। রাস্তার নামকরণ হয়েছিল তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দির নামে। তিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। তবে পরবর্তী সময়ে সোহরাওয়ার্দি নামটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কারণ স্যার হাসানের ভাইপো ছিলেন স্যর হাসান সোহরাওয়ার্দি, যিনি ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
কলেজ স্ট্রিট এলাকায় পারিবারিক পাঁঠার মাংসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গোপাল মুখোপাধ্যায়। সেই সূত্রেই তাঁর পরিচিতি হয় ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে। বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির দাবি, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে বহু হিন্দুর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। ফলে তাঁদের কাছে তিনি এক প্রতিরোধের প্রতীক।গত বছর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর নিহতদের স্মরণে আয়োজিত পদযাত্রায় শুভেন্দু অধিকারী গোপাল পাঁঠার ছবি বহন করেছিলেন। পরে আলিপুরে তাঁর মূর্তিও উন্মোচন করা হয়। সেই রাজনৈতিক বার্তার ধারাবাহিকতা হিসেবেই অনেকেই বর্তমান নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে দেখছেন।
১৯৪৬ সালে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-র কথা প্রায়ই বলে থাকে বিজেপি। ১৯৪৬ সালে হিন্দু হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন গোপাল মুখোপাধ্যায়। হিন্দুদের মসিহা হয়ে উঠেছিলেন। হিন্দুদের রক্ষা করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। বউবাজারের মলঙ্গালেন নিবাসী গোপালদের একটি পারবারিক পাঁঠার দোকান ছিল কলেজ স্ট্রিটে। পেশায় তিনি একজন কসাই। সেই জন্য তাঁকে গোপাল পাঁঠা বলা হত।
১৯৪৬ সালের ১৬ অগস্ট, মহম্মদ আলি জিন্নার নেতৃত্বে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে হিসাবে ঘোষণা করা হয়। কলকাতায় শুরু হয় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। কয়েকদিন ধরে চলে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। ইতিহাসে এই ঘটনাই ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত। সেই অস্থির সময়ে গোপাল পাঁঠা এবং তাঁর অনুগামীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বলে দাবি করা হয়। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা মত রয়েছে, তবুও একাংশের কাছে তিনি আজও প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার প্রতীক।
এদিকে এই নাম পরিবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি ইতিহাসের এক ‘অবহেলিত চরিত্রকে’ সম্মান জানানো। বিরোধীদের মতে, ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সেই সময়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী গদিতে হোসেন শাহিদ সোহরাওয়ার্দি। শোনা যায় তাঁর নির্দেশে ওই সময় ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসেছিল পুলিশ। দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে নিজের দলবল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাঠে নামেন গোপাল পাঁঠা। রক্ষা করেন শত শত প্রাণ। ২০০৫ সালে খানিকটা অন্তরালেই সেই গোপাল পাঁঠার মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে, একটি রাস্তার নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে চলে এসেছে কলকাতার ইতিহাস, দেশভাগ-পূর্ব রাজনীতি এবং ১৯৪৬ সালের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মৃতি।