ভারতের হাজার হাজার বছরের প্রাচীন সনাতন সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং গৌরবময় ঐতিহ্য শুধু ভারতবর্ষের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ছড়িয়ে রয়েছে সমগ্র এশিয়া মহাদেশ তথা বিশ্বজুড়ে। কিন্তু ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ে বিদেশী শত্রু ও আক্রমণকারীদের লাগাতার লুণ্ঠন, ভাঙচুর এবং নির্মম অবহেলার কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা সেইসব প্রাচীন হিন্দু মন্দির ও স্থাপত্যগুলো দীর্ঘকাল ধরে জীর্ণ ও ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পড়েছিল। ২০১৪ সালে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করার পর, এক মহান দূরদর্শী ও যুগান্তকারী জননেতার মতো সেই হারিয়ে যাওয়া আধ্যাত্মিক ও সভ্যতাগত ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক ঐতিহাসিক ব্রত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
বিগত ১২ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং অনন্য কূটনীতির মাধ্যমে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যগুলোকে একের পর এক পুনরুদ্ধার ও সংস্কার করে চলেছেন। বিশ্বমঞ্চে সনাতন সংস্কৃতির এই পুনর্জাগরণের সর্বশেষ ও দেদীপ্যমান উদাহরণ তৈরি হলো সম্প্রতি তাঁর ইন্দোনেশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের যোগ্যাকার্তার কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রমবানান মন্দির কমপ্লেক্সটি হলো সেই দেশের বৃহত্তম এবং কম্বোডিয়ার আঙ্কোর ওয়াতের পর সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হিন্দু মন্দির। সেই ঐতিহাসিক মন্দিরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিশেষ প্রার্থনা করার পাশাপাশি, এর প্রাচীন গৌরব ও স্থাপত্যকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের জন্য ইন্দোনেশিয়া সরকারের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
এই যুগান্তকারী চুক্তির অধীনে ইন্দোনেশিয়া সরকার এবং ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া বা এএসআই যৌথভাবে এই মেগা মন্দিরের সংস্কার কাজ সম্পন্ন করবে। তবে শুধু ইন্দোনেশিয়াই নয়, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে বসেন নরেন্দ্র মোদী এবং সেই বছর থেকেই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রাচীন সনাতন স্থানগুলির পুনরুদ্ধারের এক ধারাবাহিক মহাযজ্ঞ শুরু হয়। ভিয়েতনামে ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘মি সন’ অভয়ারণ্যের মতো প্রাচীন চম্পা রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র শৈব মন্দির কমপ্লেক্সটির পুনরুদ্ধারের কাজ মোদী সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
এরপর ২০১৫ সালে ভগবান শিবের প্রতি উৎসর্গীকৃত শ্রীলঙ্কার পাঁচটি প্রাচীন ‘পঞ্চ ঈশ্বরম’ মন্দিরের অন্যতম ঐতিহাসিক তিরুকেথিশ্বরম মন্দিরের সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের জন্য মোদী সরকার এক ঐতিহাসিক চুক্তি বা মউ স্বাক্ষর করে এবং ভারত সরকারের তরফ থেকে ৩২ কোটি ৬০ লক্ষ শ্রীলঙ্কান রুপি অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়।
একইভাবে, নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর, সেখানকার প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় ৫ কোটি মার্কিন ডলারের এক বিশাল পুনর্গঠন সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করে মোদী সরকার, যার অধীনে ঐতিহাসিক সেতো মচ্ছিন্দ্রনাথ মন্দির এবং বুধানীলকণ্ঠ মন্দির ধর্মশালাসহ মোট ২৮টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানের সফল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হয়। ২০১৭ সালে মায়ানমারের বাগান প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ১২টি ঐতিহাসিক প্যাগোডা এবং আনন্দ মন্দিরের সফল সংস্কার সম্পন্ন করে ভারতের এএসআই।
শুধু বৌদ্ধ বা সনাতন রাষ্ট্রই নয়, ২০১৯ সালে মুসলিম রাষ্ট্র বাহরিন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী মানামায় অবস্থিত ২০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক শ্রীনাথজি কৃষ্ণ মন্দিরের ৪২ লক্ষ মার্কিন ডলারের এক মেগা পুনর্বিকাশ প্রকল্পের উদ্বোধন করে গোটা আরব দুনিয়াকে চমকে দেন। এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশেও ভারতের অনুদান সহায়তায় নাটোরের প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন জয় কালী মাতা মন্দির, আনন্দময়ী কালী মাতা মন্দির এবং রামকৃষ্ণ মন্দিরের সফল সংস্কার করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় ২০২১ সালে, যখন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সময় নির্মমভাবে ধ্বংস করে দেওয়া ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দিরটি ভারতের সম্পূর্ণ সহায়তায় পুনর্নির্মিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে তার দ্বারোদঘাটন করা হয়। তো তোষণ ও অবহেলার যুগ শেষ করে, বিশ্বজুড়ে সনাতন সভ্যতার অভিন্ন বন্ধন ও প্রাচীন গৌরবকে দিল্লির দরবার থেকে বিশ্ব দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক কূটনীতি সত্যিই এক নতুন ও সোনালী ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে।