ডায়মন্ড হারবারের সাধারণ ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে বিশ্বমানের আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার নাম করে দিনের পর দিন ধরে যে কত বড় এবং ভয়ঙ্কর প্রতারণার জাল বিছানো হয়েছিল, এবার তার এক জলজ্যান্ত ও শিউরে ওঠার মতো অমানবিক প্রমাণ প্রকাশ্যে এলো।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের ও বহুল প্রচারিত ‘সেবাশ্রয়’ হেলথ ক্যাম্পের বিরুদ্ধে হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানো এবং রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ বা এক্সপায়ার্ড ওষুধ বিলি করার ভূরি ভূরি অভিযোগ আগেই উঠেছিল। কিন্তু রাজ্যে ঐতিহাসিক প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর এবার সেই ভয়াবহ দুর্নীতির এক চরম করুণ ও মর্মান্তিক রূপ সামনে এসেছে। চিকিৎসা পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে সেবাশ্রয় ক্যাম্পে গিয়ে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে নিজের একটা জলজ্যান্ত পা চিরতরে খুইয়ে পঙ্গু হতে হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আক্রার বাসিন্দা মালতী বিশ্বাসকে। এই পৈশাচিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে অবশেষে প্রাক্তন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেবাশ্রয়ের ব্যবস্থাপকসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে কলকাতার রবীন্দ্রনগর থানায় একটি লিখিত এফআইআর বা অপরাধের অভিযোগ দায়ের করেছেন ওই অসহায় মহিলা ও তাঁর পরিবার।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ভুক্তভোগী মহিলার পরিবার জানিয়েছেন, সামান্য হাঁটু ব্যথা নিয়ে ভালো চিকিৎসার আশায় সেবাশ্রয় ক্যাম্পে গিয়েছিলেন মালতী দেবী। সেখানে কোনো অভিজ্ঞ বা সঠিক ডিগ্রিধারী ডাক্তার ছাড়াই, প্রাথমিক চেকআপের নামে তাঁকে বেশ কিছু ওষুধ ধরিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ, সেই সমস্ত ওষুধ খাওয়ার পর থেকেই তাঁর হাঁটুর ব্যথা কমার বদলে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে এবং ইনফেকশন ছড়াতে শুরু করে। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পরিবারটি যখন পুনরায় সেবাশ্রয় কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটে যায়, তখন নিজেদের দোষ ঢাকতে তারা তড়িঘড়ি রোগীকে এমআর বাঙুর হাসপাতালে রেফার করে দেয়।
বাঙুর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা মালতী দেবীর পায়ের অবস্থা পরীক্ষা করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পূর্ববর্তী ভুল ও অপচিকিৎসার কারণেই পায়ের এই মারাত্মক ও পচনশীল অবস্থা তৈরি হয়েছে। এরপর ‘রেফার রোগের’ চেনা ছকে রোগীকে পার্কসার্কাসের চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল হয়ে অবশেষে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। দিনের পর দিন ধরে ভুল চিকিৎসা এবং লাগাতার রেফারের জেরে পায়ের ইনফেকশন এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মালতী বিশ্বাসের ওই পাটি কেটে বাদ দিতে হয়।
এই চরম করুণ পরিণতির পর, অসহায় পরিবারটি বহুবার ডায়মন্ড হারবারের তদানীন্তন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেবাশ্রয় ক্যাম্পের উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপকদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ তৎকালীন শাসকদল ও ক্যাম্পের কর্তারা এই দরিদ্র পরিবারের আর্তনাদকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে চাননি, উল্টে বিষয়টি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস আগেই সেবাশ্রয়ের এই মেগা কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে একাধিকবার সরব হয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, সেবাশ্রয়ের নামে ডায়মন্ড হারবারের মানুষকে আসলে বোকা বানিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। চিকিৎসার নামে সেখানে ভুয়ো হাতুড়ে এবং কোনো বৈধ রেজিস্ট্রেশন নম্বরহীন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের এনে মডার্ন বা অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করানো হতো।
বিজেপি নেতার পেশ করা একটি প্রেসক্রিপশনেও দেখা গিয়েছে, যেখানে রোগীর নাম-বয়স থাকলেও রোগের কোনো বিবরণ নেই এবং চিকিৎসকের কোনো বৈধ রেজিস্ট্রেশন নম্বর পর্যন্ত খোদাই করা ছিল না। এমনকি ইউএসজি মেশিন ব্যবহারের জন্য আইনানুযায়ী যে লাইসেন্স বা সরকারি অনুমতির প্রয়োজন, তাও তোয়াক্কা করেননি অভিষেক। জনকল্যাণের ভেক ধরে, শুধুমাত্র নিজেদের প্রকল্পের সাফল্য ও ভিড় প্রমাণ করতে এলাকার সাধারণ মানুষকে জোর করে ধরে এনে এই মরণফাঁদে ফেলা হতো, যার খেসারত আজ মালতী দেবীকে নিজের পা দিয়ে দিতে হলো। বাংলায় আজ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হতেই, এই তোষণ ও অপচিকিৎসার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের আসল চেহারা মুখোশ খুলে দিতে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার এসপি ও রবীন্দ্রনগর থানার কড়া আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।