পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে এক প্রবীণ তৃণমূল নেতার মাথায় প্রকাশ্য দিবালোকে ডিম ফাটানোর ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। ঘটনার সময় বুক চিতিয়ে ‘সরকারি অর্ডার’ এবং নিজেকে এলাকার ‘ইনচার্জ’ দাবি করা সেই বিজেপি নেতা সুব্রত জানা অবশেষে দু’দিনের মাথায় সম্পূর্ণ ভোলবদল করলেন। দলীয় নেতৃত্ব এবং নতুন সরকারের কড়া মনোভাবের মুখে পড়ে নিজের ভুল স্বীকার করে সমাজমাধ্যমে নিঃশর্ত ক্ষমার ভিডিও পোস্ট করতে বাধ্য হলেন তিনি। একই সাথে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা বিজেপি সভাপতির কাছেও লিখিতভাবে ক্ষমা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন রামনগর ২ নম্বর ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির এই বিজেপি সদস্য।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার, ৮ জুলাই। রামনগর ২ নম্বর ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূল সদস্য তথা কর্মাধ্যক্ষ মানস দাসের মাথায় একের পর এক ডিম ফাটিয়ে হেনস্থা করার অভিযোগ ওঠে বিজেপি নেতা সুব্রত জানার বিরুদ্ধে। প্রকাশ্য রাস্তায় একজন প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এভাবে অপদস্ত করার প্রতিবাদে সোচ্চার হন স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্ষুব্ধ জনতা যখন সুব্রতবাবুকে চেপে ধরেন, তখন তিনি সাফাই দেন যে এই ডিম মারার পেছনে নাকি ‘সরকারি নির্দেশ’ রয়েছে। নিজেকে এলাকার ইনচার্জ বলেও দাপট দেখান তিনি। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে।
রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার গঠনের পর দলের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা নেতৃত্ব। খোদ কাঁথির বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী এই ডিম-কাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে সাফ জানান, “এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ হয়েছে। দল এবং সরকার কোনোভাবেই এসব গুণ্ডামি অনুমোদন করে না। যিনি এই কাজ করেছেন, নিশ্চিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সাংসদের এই কড়া বার্তার পরেই কার্যত টনক নড়ে অভিযুক্ত বিজেপি নেতার।
চরম অস্বস্তিতে পড়ে সুব্রত জানা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও বার্তা পোস্ট করে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন। সুর নরম করে তিনি বলেন, “গত ৮ জুলাই মানস দাসের ওপরে ডিম মারার যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত রাগের ফল। তৃণমূল জমানায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নির্যাতন এবং একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়ার জেরে তৈরি হওয়া পুঞ্জীভূত রাগ থেকেই আমি এই কাণ্ড ঘটিয়েছি। এই ঘটনায় আমাদের সরকার, জেলা সভাপতি কিংবা কোনো মণ্ডল সভাপতির বিন্দুমাত্র নির্দেশ ছিল না।”
ভিডিওতে সুব্রত জানা আরও স্বীকার করেন যে, উত্তেজনার বশে ‘সরকারি অর্ডারের’ যে দাবি তিনি করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুল ছিল। সরকারকে কালিমালিপ্ত করার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি রাজ্য সরকার, বিজেপির জেলা সভাপতি এবং সমস্ত কার্যকর্তাদের কাছে হাতজোড় করে ভুল স্বীকার করছি। ভবিষ্যতে আর কখনো এমন কাজ করব না।” রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন শুভেন্দু অধিকারী সরকার যেখানে রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মরিয়া, সেখানে দলের নিচুতলার কর্মীদের এমন বেলাগাম আচরণ রুখতে সাংসদের কড়া মনোভাব অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দিল।