পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর, গরীব মানুষের হকের টাকা নিয়ে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণ রুখতে এবার এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কঠোরতম প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্যের নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া ও আপোষহীন নির্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, এবার আবাস যোজনা প্রকল্পের টাকা বেআইনিভাবে আত্মসাৎ করা অযোগ্য ও ভুয়ো উপভোক্তাদের কাছ থেকে সরকারি অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু করে দিয়েছে বীরভূম জেলা প্রশাসন।
তোষণ এবং কাটমানি সংস্কৃতির অন্ধকার যুগ শেষ করে, প্রকৃত অভাবী মানুষের মাথার ছাদ নিশ্চিত করতে বীরভূমের নলহাটি ২ নম্বর ব্লকের ভদ্রপুর ১ নম্বর পঞ্চায়েতের মোস্তফাডাঙ্গা গ্রামে একযোগে ২২ জন ভুয়ো উপভোক্তাকে সরকারি টাকা ফেরতের কড়া আইনি নোটিশ জারি করেছেন ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক বা বিডিও। প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই বেআইনিভাবে তোলা টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিলে, ওই সমস্ত ব্যক্তিদের সমস্ত ধরণের সরকারি সুযোগ-সুবিধা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং একই সাথে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি মামলা দায়ের করে জেলের গরাদের পেছনে পাঠানো হবে।
অনুসন্ধানে নেমে প্রশাসন জানতে পেরেছে যে, যাদের নামে এই চরম নোটিশ পাঠানো হয়েছে, তাদের অধিকাংশেরই গ্রামে ঢোকার মুখে বিশাল ও চোখধাঁধানো পাকা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আবাস যোজনা প্রকল্পের প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে। এমনকি এই জঘন্য চুরির সাথে যুক্ত রয়েছে খোদ সিভিক ভলেন্টিয়ারের মতো সরকারি কর্মীরাও, যারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে বাবার নামে বা ছেলেকে আলাদা দেখানোর চেনা ও নোংরা ছক সাজিয়ে গরীবের টাকা পকেটে পুরেছে। কেউ কেউ আবার এই দুর্নীতির টাকায় গ্রামে রীতিমতো অট্টালিকা বা প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করাও শুরু করে দিয়েছিল।
প্রশাসনের এই কড়া চাবুকের মুখে পড়ে নোটিশপ্রাপ্ত ভুয়ো উপভোক্তাদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। সাইদুল ইসলাম বা শেখ আনিকুল ইসলামের মতো ভুয়ো তথ্য গোপনকারী উপভোক্তারা এখন সংবাদমাধ্যমের সামনে টাকা খরচের দোহাই দিয়ে কিস্তির মাধ্যমে টাকা ফেরতের কিংবা জেলের ভয়ে কাতর হয়ে আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু বিডিও প্রিয়াঙ্কা সাধু খাঁ এবং রামপুরহাট বিধানসভার বিধায়ক ধ্রুব সাহা স্পষ্ট ও যুগোপযোগী ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা তথ্য গোপন রেখে সরকারি টাকা লুটের মানসিকতা দেখিয়েছেন, তাঁদের কোনো রকম রেয়াত বা ছাড় দেওয়া হবে না এবং প্রতিটা অন্যায়ভাবে নেওয়া পয়সা সরকারকে ফেরত দিতেই হবে।
আসলে, এই নলহাটির আবাসের দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের টাকা নয়ছয় করার এই নোংরা সংস্কৃতির শিকড় কিন্তু অনেক গভীরে প্রোথিত, যা বিগত দিনে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল ছিল। অতীতে যেখানে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে সাধারণ মানুষকে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মানুষের জীবন ও অধিকার নিয়ে খেলা হতো, যার খেসারত দিতে হতো সাধারণ জনগণকে, ঠিক একইভাবে এই আবাস যোজনাতেও প্রকৃত দরিদ্রদের বঞ্চিত করে একদল সুবিধাবাদী সিন্ডিকেট রাজ কায়েম করা হয়েছিল।
অতীতে বহু ক্ষেত্রে দেখা যেত যে প্রচারসর্বস্ব জালিয়াতির আখড়া বানিয়ে ওষুধের মান বা ডাক্তারের রেজিস্ট্রেশনের কোনো বালাই ছাড়াই ক্যাম্পের নামে মানুষকে টুপি পরানো হতো এবং কোনো জবাবদিহিতা থাকত না। ঠিক তেমনই আবাস যোজনার তালিকাতেও প্রকৃত দরিদ্রদের নাম বাদ দিয়ে নিজেদের ঘনিষ্ঠদের নাম ঢুকিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলায় আজ শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় আইনের শাসন ও কড়া নজরদারি প্রতিষ্ঠা হতেই, এই ধরণের সমস্ত দুর্নীতি ও জালিয়াতদের ডানা ছাঁটতে প্রশাসন যেভাবে ময়দানে নেমেছে, তা সত্যিই বাংলার ক্ষয়ে যাওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রকৃত জাস্টিস ফিরিয়ে আনার এক সোনালী অধ্যায়ের সূচনা করল।