বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভার দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় আমেরিকা ও ইউরোপকে ঘিরেই বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্র ছিল। কিন্তু এখন সেই ছবি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এশিয়া ক্রমশ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় মুখ হয়ে সামনে আসছে ভারত।বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাক্সের বক্তব্য সেই সম্ভাবনাকেই আরও জোরালো করছে। তাঁর মতে, আগামী ২৫ বছরে ভারতের অর্থনীতি এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে, যেখানে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভারতকে আর শুধু একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেখা হবে না, বরং বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখতে হতে পারে।
ভারতের এই উত্থানের পিছনে রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা, বড় বাজার, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি এবং পরিষেবা খাতের শক্তি। পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও ভারত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক দশকে ভারতের অর্থনীতির আকার আরও দ্রুত বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, দক্ষতা এবং পরিকাঠামোর মতো জায়গায় আরও বড় উন্নতি দরকার।স্যাক্সের পূর্বাভাসের সবচেয়ে বড় চমক অবশ্য আমেরিকাকে ঘিরে। তাঁর মতে, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ভারত ও চিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে এবং আমেরিকা চলে যেতে পারে তৃতীয় স্থানে। তবে এটি কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। অর্থনীতির গতিপথ নির্ভর করে বহু বিষয়ের উপর। তাই এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি একটি পূর্বাভাস হিসেবেই দেখা উচিত।
এখানে চিনের প্রসঙ্গও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক প্রয়োজনও কম নয়। ভারত যেমন চিনের প্রযুক্তি, পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তেমনই বিশাল ভারতীয় বাজারও চিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
ভারত ও চিন যদি ভবিষ্যতে বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে পারে, তাহলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের গতিপথেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। কারণ দুই দেশই বিশ্বের বিশাল বাজার এবং উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সব মিলিয়ে জেফরি স্যাক্সের বক্তব্য আসলে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ছবি দেখাচ্ছে। আগামী ২৫ বছরে ভারতের সামনে বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তির শীর্ষে ওঠার বড় সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শুধু অর্থনীতির আকার বাড়লেই হবে না, সেই বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনেও তার সুফল পৌঁছতে হবে। তাহলে সত্যিই বিশ্ব অর্থনীতির মসনদে আমেরিকা-ইউরোপের পাশাপাশি ভারতকে কেন্দ্র করে নতুন এক শক্তির ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।