দুর্গাপুজোর প্রাঙ্গণে বামপন্থীদের বইয়ের স্টল দেওয়া নিয়ে শুরু হওয়া রাজনৈতিক তরজা এবার চরম উত্তেজনার রূপ নিল! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন— ‘শারদোৎসব’ শব্দটিকে বাদ দিয়ে ব্যানারে স্পষ্ট হরফে ‘দুর্গাপূজা’ না লিখলে কমিউনিস্টদের কোনো বইয়ের স্টল করতে দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর সেই কড়া বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুললেন বিজেপি বিধায়ক বিরাজ বিশ্বাস। সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন— পুজোমণ্ডপের পাশে স্টল দিতে হলে সেখানে ‘দুর্গাপুজো’ লিখতেই হবে, আর তা না লেখা থাকলে তিনি নিজে গিয়ে সেই সমস্ত স্টল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবেন!
বিধায়ক বিরাজ বিশ্বাসের সোজাসাপ্টা আক্রমণ— যাদের মতাদর্শে ধর্মের কোনো অস্তিত্বই নেই, যারা ধর্মকে কেবল ‘আফিম’ বলে প্রচার করে এসেছে, তারা কেন পুজোর পুণ্য আঙিনায় এসে ব্যবসার পসরা সাজাবে? তাদের জন্য পুজো নয় বলেই তোপ দাগেন তিনি। বিজেপি বিধায়কের এই আগ্রাসী মন্তব্যের পরই ময়দানে নেমেছে বাম শিবিরও। বিধায়কের হুমকির কড়া জবাব দিয়ে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জরুরি অবস্থার দিনগুলোর উদাহরণ টেনে এনে পাল্টা সুর চড়ান। সেলিমের স্পষ্ট বক্তব্য— অতীতে কংগ্রেস জমানায় সঞ্জয় গান্ধীও ঠিক করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিশোর কুমারের গান বাজবে কি না, কিন্তু মানুষ তা মেনে নেয়নি। যারা লাথি মারে ইতিহাস তাদের নাম মুছে দেয়, আর যারা আঘাত পায় তারা হাত মুঠো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে রাজ্যে যদি আইনের শাসন ভেঙে পড়ে তবে সেই সম্পূর্ণ ব্যর্থতার দায় মুখ্যমন্ত্রী সহ প্রশাসনকেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সেলিম।
পুজো যত এগিয়ে আসছে, এই মতাদর্শগত লড়াইয়ের পারদ ততই চড়ছে। বিধানসভার পর গণেশপুজোর মঞ্চ থেকেও বামেদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি অভিযোগ তোলেন— প্যান্ডেল থেকে কিছুটা দূরে লাল শালু টাঙিয়ে যে স্টলগুলো সাজানো হতো, সেখানে বেলুড় মঠের উদ্বোধন প্রকাশনী কিংবা ভারত সেবাশ্রমের প্রণব প্রকাশনীর কোনো আধ্যাত্মিক বই রাখা হতো না। এমনকি বাংলার আসল ইতিহাস, বঙ্গভঙ্গ, গীতা কিংবা হনুমান চালিসার মতো গ্রন্থ খুঁজে পাওয়া যেত না, বরং শুধু কার্ল মার্ক্স আর লেনিনের বই দিয়েই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হতো।
মুখ্যমন্ত্রীর এই আক্রমণের জবাব দিতে গিয়ে সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ অবশ্য ইতিহাসের পাতা উল্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন— আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে বাঙালিকে কার্ল মার্ক্স ও লেনিনের দর্শন পড়তে যিনি প্রথম শিখিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দের নিজের সহোদর বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। সব মিলিয়ে, একদিকে ‘দুর্গাপুজো’ বনাম ‘শারদোৎসব’ বিতর্ক, আর অন্যদিকে স্টল ভাঙার রক্তচক্ষু ও প্রতিরোধের হুঙ্কার— উৎসবের মরশুমে মতাদর্শের এই মুখোমুখি সংঘাত গোটা রাজ্য রাজনীতিকে চরম উত্তাল করে তুলেছে।