জাতীয় রাজনীতিতে ফের এক বিরাট ও ঐতিহাসিক সংস্কারের দামামা বাজিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ! রবিবার মুম্বইয়ের হাই-ভোল্টেজ সাংবাদিক বৈঠক থেকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন— ২০২৯ সালের আগেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-শাসিত দেশের ২১টি রাজ্যে চালু হতে চলেছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ইতিমধ্যেই উত্তরাখণ্ডের মাটিতে ইউসিসি সফলভাবে বাস্তবায়িত করে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বিজেপি সরকার। এবার সেই একই মডেলকে সামনে রেখে ২০২৯-এর সাধারণ নির্বাচনের বহু আগেই এনডিএ-র দখলে থাকা সমস্ত রাজ্যে সমতা ও অভিন্ন অধিকার নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিল কেন্দ্র।
কী এই ইউসিসি আর এতে নাগরিক জীবনে কী বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে? বর্তমানে আমাদের দেশে ধর্মভেদে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার কিংবা সন্তান দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইন বা পার্সোনাল ল’ প্রযোজ্য রয়েছে। কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে ধর্মের ভিত্তিতে সেই ভিন্ন নিয়মের প্রাচীর ভেঙে যাবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য পারিবারিক ও নাগরিক অধিকারে কার্যকর হবে একটিই অভিন্ন সংবিধান ও সমান আইনি পরিকাঠামো। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম প্রধান আদর্শগত ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল এই আইন। শাহের এই আগ্রাসী ঘোষণার ফলে দেশজুড়ে আবারও শুরু হতে চলেছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা।
সাংবাদিক বৈঠকে কেবল ইউসিসি নয়, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং এনআরসি প্রসঙ্গেও সরকারের কঠোর মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মণিপুরে ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে এনআরসি চালুর বিষয়ে তিনি জানান— স্থানীয় রাজনৈতিক দল ও সহকর্মীদের সাথে আলোচনা চলছে এবং সময়মতোই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তবে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে কোনো রাখঢাক না রেখে শাহ সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন— দেশের প্রতিটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবেই! এর জন্য সরকারের অভ্যন্তরীণ কৌশল কী হবে, তা অবশ্য এখনই প্রকাশ করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
জাতীয় সুরক্ষায় সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন— সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, এয়ার স্ট্রাইক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি আজ বিশ্বস্বীকৃত। ৩৭০ ধারা বাতিল, নকশালবাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে স্থায়ী শান্তি ফেরানোই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বক্তব্যের শেষ পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনজীবনের বর্ণময় ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে এক মাসব্যাপী মেগা ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর ডাক দেন অমিত শাহ। যেখানে এনডিএ-র শরিক দল ও কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার সংকল্প ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে, ২১ রাজ্যে ইউসিসি লাগু করার এই মাস্টারস্ট্রোক একদিকে যেমন সনাতনী ও জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাকে এক নতুন মাত্রা দিল, তেমনই বিরোধীদের সামনে ছুঁড়ে দিল আরও এক চরম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।