শারদোৎসবের আনন্দ যেখানে বাঙালির চিরন্তন প্রাণের উৎসব, সেখানে বিগত বছরগুলিতেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উৎসবের আবহে মিশে থাকত বুকচাপা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া! পুজোর দিনগুলিতে ঢাকের আওয়াজ কতটুকু হবে, শাঁখ বাজবে কি না, কিংবা আজানের সময় মণ্ডপের মাইক জোর করে বন্ধ করতে হবে কি না— এমন বহুবিধ ভয়ের পরিবেশেই কাটত ক্যানিংয়ের সনাতনীদের দিন। এমনকি দশমীর আনন্দ তো দূর অস্ত, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক বাহুবলীদের রক্তচক্ষুর ভয়ে নবমীর দিনেই মণ্ডপ থেকে প্রতিমা তুলে তড়িঘড়ি বিসর্জন দিতে বাধ্য হতেন উদ্যোক্তারা! কিন্তু ২০২৬-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার সেই চেনা আতঙ্কের দৃশ্য সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে ক্যানিংয়ের মাটিতে ফিরল এক নতুন ভোরের আলো।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকার জীবনতলা থানার অধীনস্থ এলাকাগুলিতে কান পাতলেই এখন শোনা যাচ্ছে স্বস্তির নিঃশ্বাস। গত বছর যেখানে এই এলাকায় দুর্গাপুজোর সংখ্যা ছিল ১১৮টি, এবার সেই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬-এ! অর্থাৎ এক বছরে পুজো বেড়েছে ১৮টি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই ১৮টি পুজো কোনো নিছক সংখ্যার খতিয়ান নয়; এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে জোর করে বন্ধ করে রাখা পুজোগুলি নতুন করে বুক ফুলিয়ে ফের শুরু করার অদম্য সাহস ও সনাতনী অধিকার ফিরে পাওয়ার আত্মমর্যাদা।
অতীতে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখা প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লা আজ দুর্নীতির দায়ে শ্রীঘরে বন্দি। আর সেই বাহুবলীর প্রভাব অস্তমিত হতেই ক্যানিংয়ের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় ফিরেছে দুর্গাপুজোর খাঁটি আবহ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অকপট স্বীকারোক্তি— বিগত জমানায় মণ্ডপে মাইক বাজানো থেকে শুরু করে সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি পর্যন্ত শাসন করত একদল রাজনৈতিক দুষ্কৃতী। কখন কী কারণে পুজো বন্ধ করে দেওয়া হবে, কখন ধর্মীয় রীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হবে— এই ভয়ে পুজোর আনন্দটাই মাটি হয়ে যেত। কিন্তু প্রশাসনের রাশ বদলাতেই রাতারাতি বদলে গেছে ক্যানিংয়ের মানচিত্র।
এলাকাবাসীর স্পষ্ট বার্তা— “রাজ্যে এখন সনাতনী সরকার, ক্ষমতায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী; তাই আমাদের পুজো করতে আর কারও রক্তচক্ষুর ভয় পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” এই আত্মবিশ্বাসই আজ ক্যানিংয়ের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও নতুন করে গড়ে উঠছে সুবিশাল মণ্ডপ, কোথাও আবার বহু বছর পর ঢাকের কাঠি আর কাঁসর-ঘণ্টার রোমাঞ্চকর আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠছে গোটা চত্বর। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে এবার নবমীতে নয়, বরং বিজয়া দশমীতেই পূর্ণ মর্যাদা ও জাঁকজমক সহকারে সম্পন্ন হবে দেবী প্রতিমার নিরঞ্জন।
ভয়, ত্রাস আর ধর্মীয় দ্বিধাদ্বন্দ্বকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে ক্যানিংয়ের বুকে দুর্গাপুজোর এই মহাজাগরণ স্পষ্ট প্রমাণ করে দিল— জমানা বদলালে কীভাবে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা আর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। তোষণের অন্ধকার পেরিয়ে সম্প্রীতি ও নির্ভীক সনাতনী আরাধনার এই রঙিন ছবিই আজ নতুন বাংলার আসল বিজয়গাথা!