বিগত দেড় দশকের শাসনকালে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে রেশন বণ্টন, কয়লা কিংবা গরু পাচার— দুর্নীতির একের পর এক পাহাড়প্রমাণ অভিযোগে বারবার বিদ্ধ হয়েছে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত কোনো আর্থিক তছরুপের মামলায় খোদ দলনেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি আর্থিক লেনদেনের নথিতে সামনে আসেনি। এবার ক্ষমতা হারানোর পর সেই রক্ষাকবচও পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেল! প্রাক্তন পর্যটন মন্ত্রী তথা গায়ক-নেতা ইন্দ্রনীল সেনের আর্থিক তছরুপ মামলায় এবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র অফিসিয়াল প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি সামনে এল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। আর শুধু নাম আসাই নয়, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি লক্ষ লক্ষ টাকা ঢোকার চাঞ্চল্যকর প্রমাণ প্রকাশ্যে এনে তোলপাড় ফেলে দিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা!
ঘটনার সূত্রপাত পুজো পাস ও ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমাকে ঢাল করে কোটি কোটি টাকার তোলাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ— ক্ষমতা থাকাকালীন দুর্গাপূজার ভিআইপি পাস পাইয়ে দেওয়ার নামে এবং ইউনেস্কোর স্বীকৃতি উদযাপনের অজুহাতে বিভিন্ন মহল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তোলা হয়েছিল। এই মামলায় সম্প্রতি ইন্দ্রনীল সেনের বাড়িতে ম্যারাথন তল্লাশি চালায় ইডি এবং পরবর্তীতে সিজিও কমপ্লেক্সে তলব করে তাঁকে দফায় দফায় জেরা করা হয়।
সেই জেরার পরই ইডি যে আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তা বাংলার রাজনৈতিক মহলে আক্ষরিক অর্থেই এক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ইডি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে— ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর সংস্থা ‘অকটেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অন্তত ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা জমা পড়েছিল, যার কোনো বৈধ অর্থনৈতিক উৎস মেলেনি। আর তার চেয়েও মারাত্মক তথ্য হলো— এই বেআইনি ৩.৮ কোটি টাকার তহবিল থেকেই ‘অকটেভ রেকর্ডস’ মারফত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ট্রান্সফার করা হয়েছিল নগদ ৩০ লক্ষ টাকা!
ইডির দাবি— জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ইন্দ্রনীল সেন দাবি করেছেন যে, মমতাকে এই টাকা নাকি দেওয়া হয়েছিল ‘রয়্যালটি’ বাবদ। কিন্তু কীসের সেই রয়্যালটি, তার কোনো সদুত্তর বা আইনসম্মত নথি মেলেনি। যদিও অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার দাবি করেছেন— তাঁর আঁকা ছবি বিক্রি এবং গান লেখার রয়্যালটি থেকেই নাকি তাঁর সংসার চলে; কিন্তু পুজো পাসের কাটমানির কোটি কোটি টাকার কোম্পানির সাথে মুখ্যমন্ত্রীর সেই তথাকথিত রয়্যালটির যোগসূত্র ঠিক কী, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে টানটান তদন্ত।
এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই চরম অস্বস্তিতে পড়েছে তৃণমূলের অন্দরমহল। দলত্যাগী তথা গণতান্ত্রিক তৃণমূলের নেতা মদন মিত্র কার্যত হতভম্ব হয়ে বলেছেন— “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্দ্রনীল সেনের কাছ থেকে এমনভাবে টাকা নিয়েছেন, এটা ভাবতে আমারও কষ্ট হচ্ছে।”
অন্যদিকে এই ইস্যুতে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি। বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ সাফ ভাষায় তোপ দেগে বলেন— “এটাকে রয়্যালটি বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, ওটা আসলে তোলাবাজির কাটমানি! আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছি— বাংলার বুকে যত দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজ চলেছে, তার প্রতিটির পেছনেই মমতার প্রত্যক্ষ হাত আর মাথা রয়েছে।” ক্ষমতা হারানোর পর একে একে আলমারি থেকে বেরোতে শুরু করেছে দুর্নীতির কঙ্কাল। আর এবার খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি বেআইনি টাকার লেনদেন সামনে আসায় কালীঘাটের অন্দরে যে নতুন করে শনির দশা শুরু হলো, তা একপ্রকার নিশ্চিত