শারদোৎসবের আনন্দে যখন তিলোত্তমার রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল, ঠিক তখনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবি তুলে কলকাতায় সংঘাতের রাজনীতি উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস! মঙ্গলবার কালীঘাট তৃণমূলের ছাত্র-যুব সংগঠনের ব্যানারে রাজাবাজার থেকে এক সুবিশাল বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উৎসবের মরশুমে শহরের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা যে এক চুলও বরদাস্ত করা হবে না— সোমবার গভীর রাতে পুজো উদ্বোধনের মঞ্চ থেকেই বিরোধীদের উদ্দেশে চরম হুঁশিয়ারি ছুড়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! সাফ জানিয়ে দিলেন— রাজাবাজার থেকে তৃণমূলের মিছিলকে এক পা-ও এগোতে দেওয়া হবে না; প্রয়োজনে নামানো হবে কেন্দ্রীয় বাহিনী সিআরপিএফ!
সোমবার রাতে একটি দুর্গাপূজা উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি জানান— কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী চাঁচাছোলা ভাষায় বলেন— “বেরোতে দেব না! সিপি-কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি, রাজাবাজার থেকে মিছিল এক পা এগোতে দেওয়া হবে না। কলকাতা পুলিশ যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারে, তাহলে অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী সেন্ট্রাল ফোর্স নামাতে বলেছি। কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না; এখন দুর্গাপূজার সময়, মানুষের আনন্দের সময়।”
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, তৃণমূলের এই কর্মসূচির রুট ও সূচনাস্থল নিয়েই সবচেয়ে বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে সরকারের অন্দরে। রাজাবাজারের মতো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর এলাকাকে মিছিলের সূচনা কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে বিরোধীদের কোনো সুপ্ত প্ররোচনার ছক রয়েছে কি না— প্রশাসন সেই ‘বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকেই গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। পুজো পরিক্রমার ঠিক মুখে মধ্য ও উত্তর কলকাতার প্রধান সংযোগকারী রাস্তায় এমন রাজনৈতিক জমায়েতের অনুমতি দিয়ে সাধারণ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে দিতে নারাজ নবান্ন। যদি রাজ্য পুলিশ একা ব্যর্থ হয়, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনস্থ কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনীকে ময়দানে নামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর এই চরম হুঁশিয়ারির পর কার্যত চরম অস্বস্তিতে পড়েছে কালীঘাট শিবির। দলের ছাত্র-যুবদের ডাকা এই কর্মসূচিতে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সশরীরে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা সোমবার রাত পর্যন্ত স্পষ্ট করতে পারেনি তারা। মুখ্যমন্ত্রীর এই রণংদেহি মেজাজের পর তৃণমূলের কোনো শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। তবে ঘরোয়া আলোচনায় তাদের দাবি— নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই নাকি সরকার এই মিছিলের রুট নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
উপনির্বাচনে পরাজয়ের হতাশা ঢাকতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের নাম করে উৎসবের মরশুমে রাজপথ দখলের যে চেষ্টা চলছিল— শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে তা কার্যত জোর ধাক্কা খেল। রাজাবাজারের মোড়ে পুলিশ ও সিআরপিএফ-এর ব্যারিকেড নাকি তৃণমূলের জমায়েত— মঙ্গলবার কলকাতার রাজপথে এই শক্তিপরীক্ষা কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য!