কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভিআইপি বন্দোবস্ত নয়, কোনো অতিরিক্ত রাজকীয় আয়োজন নয়— সাধারণ সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য রোজ যে সাধারণ মিড-ডে মিল রান্না হয়, এক টেবিলে বসে বাচ্চাদের সাথে সেই খাবারই পরম তৃপ্তিতে খেলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! আর শুধু খেয়েই থেমে থাকলেন না, পরের দিনই সেই স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং রাঁধুনি মা-বোনেদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী যা পাঠালেন, তা দেখে আপ্লুত গোটা হাওড়াবাসী। ক্ষমতার উচ্চাসনে বসেও মাটির মানুষের সাথে কীভাবে মিশে যেতে হয়, হাওড়ার ব্যাঁটরা মধুসূদন পাল চৌধুরী হাইস্কুলে যেন তারই এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার। হাওড়ার ব্যাঁটরা মধুসূদন পাল চৌধুরী হাইস্কুলে রাজ্যের ‘সারথী’ প্রকল্পের আওতায় ছাত্রছাত্রীদের হাতে সাইকেল তুলে দেওয়ার সরকারি কর্মসূচির সূচনা করতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মধুসূদন স্কুলের পাশাপাশি রাজলক্ষ্মী বালিকা বিদ্যালয় এবং লিলুয়া শিক্ষা নিকেতনের কয়েকশো পড়ুয়ার হাতে তিনি নিজ হাতে সাইকেল তুলে দেন। কর্মসূচি শেষ হতেই মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি চলে যান স্কুলের মিড-ডে মিলের খাবার ঘরে। কোনো বাড়তি ভণিতা না করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মাঝেই আসন পেতে বসে পড়েন তিনি। স্কুলের শিক্ষকরা জানান— মুখ্যমন্ত্রীর জন্য আলাদা কোনো ভিআইপি মেনু তৈরি করা হয়নি; প্রতিদিন সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যে ডাল-ভাত-তরকারি খায়, ঠিক সেটাই পরম তৃপ্তির সাথে খেয়েছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। স্কুলের রান্নার মান এবং মিড-ডে মিল ব্যবস্থার মুক্তকণ্ঠে প্রশংসাও করেন তিনি।
কিন্তু আসল চমক অপেক্ষা করছিল ঠিক তার পরের দিন, অর্থাৎ বুধবার সকালে! মিড-ডে মিলের সেই সুস্বাদু খাবার খেয়ে আপ্লুত মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দপ্তরকে নির্দেশ দেন ওই স্কুলের জন্য বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করতে। বুধবার সকাল হতেই মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ব্যাঁটরা মধুসূদন পাল চৌধুরী স্কুলে পৌঁছে যায় ৮৫০ পিস টাটকা রুই মাছ এবং হাঁড়িভর্তি রসগোল্লা! শুধু তাই নয়, যে মহিলা কর্মীরা প্রতিদিন ভালোবাসা দিয়ে বাচ্চাদের এই মিড-ডে মিল রান্না করেন, সেই ৬ জন রাঁধুনির জন্য মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে পাঠিয়ে দেন পুজোর উপহার— নতুন শাড়ি এবং নগদ ৫০০ টাকা করে আর্থিক সম্মান!
বুধবার স্কুল চত্বরে তৈরি হয় এক এলাহী ও উৎসবের পরিবেশ। রাজলক্ষ্মী বালিকা বিদ্যালয় ও লিলুয়া শিক্ষা নিকেতনের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদেরও ডেকে নেওয়া হয় মধুসূদন স্কুলে। স্কুলের মিড-ডে মিলের রান্নাঘরে শুরু হয় মুখ্যমন্ত্রীর পাঠানো রুই মাছের কালিয়া তৈরির প্রস্তুতি। দুপুরে তিন স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের পাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সাথে যখন পড়ল রুই মাছের কালিয়া আর মিষ্টি রসগোল্লা, তখন কচিকাঁচাদের চোখেমুখে উপচে পড়েছিল অপার আনন্দ।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান— মুখ্যমন্ত্রীর এই সারল্য ও আন্তরিকতা তাঁদের কল্পনাতীত। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তাও পাঠানো হয়েছে নবান্নে। অন্যদিকে নতুন শাড়ি হাতে পেয়ে আপ্লুত রাঁধুনি মহিলারা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। সাধারণ মানুষের সেবক হিসেবে নিজের কথা যে তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন, হাওড়ার এই মানবিক দৃশ্য ফের একবার প্রমাণ করে দিল— আমজনতার হৃদয়ে শুভেন্দু অধিকারীর জায়গা কেন আজ এত গভীরে!
