এসআইআর অর্থাৎ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের পর এবার এসএসআর বা স্পেশাল সামারি রিভিশনকে কেন্দ্র করে ফের নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাতের রণক্ষেত্র হয়ে উঠল রাজ্যের নির্বাচনী আঙিনা! মঙ্গলবার কলকাতার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও দপ্তরে আয়োজিত সর্বদলীয় বৈঠকে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিশেষ করে ‘ফর্ম-৭’ জমা দেওয়ার নিয়মাবলী ঘিরে বাঁধল নজিরবিহীন হট্টগোল। একটি নির্দিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্র থেকে একজন ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০টি পর্যন্ত ‘ফর্ম-৭’ জমা দিতে পারবেন— নির্বাচন কমিশনের এই নতুন নিয়মকে হাতিয়ার করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের একযোগে আশঙ্কা, এই বিধির অপব্যবহার করে বৈধ ও যোগ্য ভোটারদের নাম গণহারে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলার চক্রান্ত চলছে। আর সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই সিইও দপ্তরের ভেতরে একসুরে কমিশনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব!
বৈঠক শেষে বেরিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তাঁর সরাসরি অভিযোগ— অতীতে চলা এসআইআর প্রক্রিয়াই এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়নি, তার মধ্যে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই রাজ্যের ওপর নতুন করে এসএসআর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কুণাল ঘোষ সাফ জানান— কোনো যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অপচেষ্টা বাংলা বরদাস্ত করবে না। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফর্ম-৭ জমা পড়লে কতদিনের মধ্যে সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে, তার কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেনি কমিশন। এমনকি বৈঠকে তোলা দলগুলির আপত্তি কার্যবিবরণীতে রেকর্ড না করা এবং মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়ে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তোলে তৃণমূল।
একই সুরে সুর মিলিয়ে কংগ্রেসের আশুতোষ চ্যাটার্জি সরাসরি কমিশনের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। আশুতোষবাবুর দাবি— ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত বিচারপতির অভাব থাকায় ভোটার সংক্রান্ত আইনি নির্দেশ আপলোড করা যাচ্ছে না। যার ফলে শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার এবং হাওড়া জেলায় প্রায় ৩৯ হাজার সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কার্যত চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করতেই ফর্ম-৭-এর এই শিথিল নিয়ম চালু করা হয়েছে বলে কংগ্রেসের দাবি। অন্যদিকে বামফ্রন্টের পলাশ দাসও স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান— নতুন নিয়মের আড়ালে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়ার বড়সড় ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বামেরা।
কিন্তু বিরোধীদের এই সমবেত আক্রমণের মুখে নীরব থাকেনি বিজেপি নেতৃত্ব। দলের প্রতিনিধি শিশির বাজরিয়া বিস্ফোরক সব তথ্য তুলে ধরে পালটা আক্রমণ শানান। শিশিরবাবুর দাবি— বিগত দিনে তৈরি হওয়া ভোটার তালিকায় গুরুতর সব জালিয়াতি ও গরমিল লুকিয়ে রয়েছে, যা সংশোধন করা একান্ত জরুরি। তিনি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন— হাওড়ার বালিতে একজন ভোটারের বিপরীতে নাকি ৩১০ জন সন্তান নথিভুক্ত রয়েছে এবং আসানসোলে অন্য এক ভোটারের রয়েছে ৩৮৯ জন সন্তান! বিজেপির প্রশ্ন— এই ধরনের ভৌতিক ও অবিশ্বাস্য গরমিল কি দিনের পর দিন ভোটার তালিকায় রাখা হবে? এসআইআর-এর সময় অন্যান্য দলগুলো কেন এই পাহাড়প্রমাণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিশির বাজরিয়া।
কিন্তু আইনত ঠিক কী এই ফর্ম-৭ এবং কেনই বা একে ঘিরে এত শোরগোল? মূলত ভোটার তালিকায় থাকা কোনো অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে লিখিত আপত্তি জানাতেই ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের এই ফর্ম-৭ ব্যবহার করা হয়। কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে নাম বাদ দেওয়ার জন্য, স্থায়ীভাবে বিধানসভা কেন্দ্র বদল করলে পুরনো কেন্দ্রের নাম কাটার জন্য, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম থাকলে তা বাতিল করতে অথবা কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অ-নাগরিক ভুলবশত তালিকায় ঢুকে পড়লে তাঁর নাম সরানোর আইনি হাতিয়ার হলো এই ফর্ম। তবে কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে— ফর্ম-৭ জমা দেওয়ার পর তা সরাসরি গৃহীত হয় না; ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও-র উপস্থিতিতে শুনানিতে অভিযোগকারীকে উপযুক্ত প্রমাণ পেশ করতে হয়। এমনকি ফর্ম-৭-এ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো মিথ্যা তথ্য বা ভুয়ো অভিযোগ দায়ের করা হলে, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ নম্বর ধারা অনুযায়ী অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কড়া কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার ভয় বনাম তালিকার মারাত্মক ভুল শুধরে ভুয়ো ভোটার ছাঁটার দাবি— দুই সমান্তরাল রাজনৈতিক তরজায় ফর্ম-৭-কে কেন্দ্র করে ভোটমুখী বাংলার পারদ যে চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
