উপনির্বাচনের রণক্ষেত্র থেকে জোড়াফুল প্রতীক ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন কাটতে না কাটতেই এবার তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য আছড়ে পড়ল আরও এক প্রলয়ঙ্কারী আইনি ও রাজনৈতিক বিপর্যয়! নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের পর এবার আসন্ন পুরভোটেও ইভিএম-এর পর্দায় জোড়াফুল প্রতীক থাকার আর কোনো বাস্তব সম্ভাবনা রইল না। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের ঐতিহাসিক নির্দেশের পর কার্যত মাথায় হাত কালীঘাট শিবিরের। যে দল একদা গোটা বাংলাকে নিজেদের একচ্ছত্র জমিদারি মনে করত, সেই দলেরই আসল নাম ও প্রতীক এবার হাতছাড়া হয়ে গেল আগামী অন্তত চার মাসের জন্য!
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিল তৃণমূলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক সংক্রান্ত এই মেগা মামলার শুনানি। নির্বাচন কমিশনের প্রতীক ফ্রিজ করার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীরা। তাঁদের মরিয়া আর্জি ছিল— অক্টোবর মাসের মধ্যেই যেন কমিশন এই বিতর্কের নিষ্পত্তি করে দেয়, যাতে পুজোর পরই অনুষ্ঠিত হতে চলা কলকাতা, হাওড়া সহ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পুরসভা নির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে মাঠে নামা যায়। কিন্তু শীর্ষ আদালত সেই তড়িঘড়ি দাবিকে সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নব তৃণমূল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট শিবির— উভয় পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার জন্য চার সপ্তাহের সময় দেওয়া হচ্ছে। আর সেই সমস্ত নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে জাতীয় নির্বাচন কমিশন আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আগামী চার মাসের আগে জোড়াফুল প্রতীকের তালা খোলার কোনো সম্ভাবনাই নেই!
শুনানি চলাকালীন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আদালতকে জানান— প্রতীক ও দলের অধিকার নির্ধারণ করা কোনো ছেলেখেলা নয়। জেলা থেকে তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে লক্ষাধিক আবেদন ও নথি জমা পড়তে চলেছে। তাছাড়া কমিশনের সামনে রয়েছে দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। ফলে এই বিপুল নথি যাচাই ও স্ক্রুটিনি করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি যখন কমিশনের আধুনিক প্রযুক্তি ও মেশিন লার্নিং ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন, তখন কমিশনের আইনজীবী স্পষ্ট জানান যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও মাঠপর্যায়ের সত্যতা ও নথি যাচাই করতে এই নির্দিষ্ট সময়টুকু তাঁদের লাগবেই।
এর আগে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশন ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ফ্রিজ করে দিয়েছিল। মমতা শিবিরকে বাধ্য হয়ে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক এবং ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে দেওয়া হয়েছে ‘খাম’ প্রতীক ও ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম। প্রতীক হারানোর সেই চরম মানসিক ধাক্কাতেই নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে ভয়ে ময়দান ছেড়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, আর রেজিনগরে প্রার্থী রবিউল করিমকে কার্যত জোর করে লড়াইয়ে ধরে রাখতে হয়েছে।
দলীয় ক্যাডার ও কর্মীদের মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকায় পুরভোটের আগে জোড়াফুল ফিরে পেতে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছিল কালীঘাট। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই চার মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পর স্পষ্ট হয়ে গেল— আসন্ন কলকাতা ও হাওড়া পুরভোটেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে লড়তে হতে পারে সেই আনকোরা ফুটবল প্রতীক নিয়েই! ক্ষমতার দম্ভ আর ঔদ্ধত্যে মেতে থাকা দলটির আজ এমন করুণ দশা যে, নিজস্ব প্রতীকের অস্তিত্ব ফিরে পেতেও এখন মাসের পর মাস আদালতের চত্বরে লাইন দিতে হচ্ছে। বাংলার রাজনৈতিক মহলের মতে— প্রতীকহীন, পতাকাহীন তৃণমূল কংগ্রেসের এই আইনি পরাজয় পুরভোটের মুখে তাদের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল!