রাজনীতিতে তিনি পোড়খাওয়া সৈনিক। ৫৩ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের সেই ভোর, আজও যেন তাপস রায়ের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে তাঁর বাড়িতে ইডি হানার নেপথ্যে বিজেপি ছিল না। বরং কলকাঠি নেড়েছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাঁদের কথাতেই তাঁর বাড়িতে ইডি পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই অভিযোগ সামনে এনে কার্যত রাজনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তাপস।
তিনি সরাসরি বলেন, “আমি সেদিনও বলেছি, আজও বলছি…যে আমার বাড়িতে ইডি পাঠিয়েছিল, তাঁকে আমি জেলের ঘানি টানিয়েই ছাড়ব।” একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মুখে এমন হুঙ্কার স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। কারণ, তাপস রায় কোনও সাধারণ নেতা নন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কলকাতা ও রাজ্য রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত মুখ তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু কী এমন ঘটেছিল, যার পর নিজের পুরনো দল ও পুরনো নেত্রীকেই কাঠগড়ায় তুললেন তাপস?
ফিরে যেতে হবে ২০২৪ সালের সেই ঘটনায়। পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ভোরবেলা তাপস রায়ের বাড়িতে পৌঁছে যায় ইডি। বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের সেই বাড়িতে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলে তল্লাশি। সন্ধ্যায় যখন আধিকারিকরা বেরিয়ে আসেন, তাঁদের হাতে ছিল তাপস রায়ের মোবাইল ফোন এবং কিছু নথিপত্র। সেই ঘটনাই নাকি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাপস রায়ের অভিযোগ, ওই হানার পর থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, নিজের দলেই তাঁকে টার্গেট করা হচ্ছে। আর সেই কারণেই তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।
আজ তিনি বিজেপির বিধায়ক। মানিকতলা থেকে জয়ী হয়ে বিধানসভায় এসেছেন। কিন্তু পুরনো ক্ষোভ আজও এতটাই তীব্র যে, সুযোগ পেলেই বিস্ফোরক আক্রমণ শানাচ্ছেন প্রাক্তন দল ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। নিজের সততার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তাপস রায় বলেন, “আমার ৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবন। সাড়ে ১৩ বছর তৃণমূল সরকারের বিধায়ক ছিলাম।
একটাও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে দেখান।” শুধু তাই নয়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “সুদীপের রাজনৈতিক কেরিয়ার আমি শেষ করব।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য শুধুই ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, এটা আসলে তৃণমূলের অন্দরের বহু পুরনো গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, তাপস রায় এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতা রাজনীতিতে এই সংঘাতের কথা শোনা যেত। কিন্তু এদিন তাপস রায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নাকি পেনড্রাইভ আছে, নথি আছে। সেগুলো জনসমক্ষে আনুন।নয়তো ওঁকে আর ওঁর ভাইপোকে জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ব।” এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
তবে শুধু ক্ষোভ নয়, এদিন আবেগঘন স্মৃতিচারণাও করেন তাপস রায়। তিনি বলেন, একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে তাপসদা বলে ডাকতেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই সম্বোধন বদলে যায়। তাপসের কথায়, “ক্ষমতা মানুষের সম্বোধনও বদলে দেয়।” তাপস রায়ের দাবি, ইডি হানার সেই ঘটনার পর তাঁর স্ত্রী আজও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
আজও সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অন্যদিকে নতুন বিজেপি সরকার নিয়েও আশাবাদী শোনাল তাপস রায়কে। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন তিনি।
