আবাসের ঘর, ভুয়ো ভোটার কিংবা একশো দিনের কাজের ভুয়ো জব কার্ড— দুর্নীতির তালিকা যেন কিছুতেই থামছে না! এবার তৃণমূল জমানার তথাকথিত ড্রিম প্রজেক্ট ‘স্বাস্থ্যসাথী’কে কেন্দ্র করে সামনে এল বাংলার ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ! সরকারি খাতায় লক্ষ লক্ষ কার্ড ইস্যু হয়েছে, সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা বেসরকারি নার্সিংহোমের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফারও হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে সেই কার্ডধারীদের কোনো অস্তিত্বই নেই! নবান্ন সূত্রে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য— প্রায় ৩০ লক্ষেরও বেশি স্বাস্থ্যসাথী উপভোক্তার কোনো বাস্তব হদিশই মিলছে না! আর এই ভূতুড়ে উপভোক্তাদের নামে রাজ্যবাসীর করের প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা অবাধে লুঠ করা হয়েছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন রাজ্যের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।
কীভাবে প্রকাশ্যে এল এই শতাব্দীর অন্যতম বড় আর্থিক গরমিল? নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, বদলের বাংলায় স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে আরও স্বচ্ছ ও সর্বভারতীয় মানের করতে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ এবং ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা’র আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে নতুন সরকার। সেই লক্ষ্যেই স্বাস্থ্যসাথীর উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করতে এবং নতুন কার্ড বিলি করতে স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন বাড়ি বাড়ি সার্ভে করতে পৌঁছন, তখনই ফাঁস হয়ে যায় আসল রহস্য। দেখা যায়, সরকারি ডেটাবেসে যে ঠিকানা ও নাম নথিভুক্ত রয়েছে, বাস্তবে সেখানে ওই নামের কোনো মানুষ কোনোদিনই বসবাস করেননি! হাজার হাজার গ্রাম ও ওয়ার্ডে একের পর এক উপভোক্তা স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন। প্রাথমিকভাবেই প্রায় ৩০ লক্ষেরও বেশি এমন ‘ভুয়ো’ ও অস্তিত্বহীন কার্ডের হদিশ মিলেছে।
বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল জমানার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রাথমিক অডিট রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি সরাসরি দাবি করেন— এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং একটি সুসংগঠিত মাফিয়া সিন্ডিকেটের কাজ। ভুয়ো চিকিৎসক তৈরি করা, ডাক্তারের জাল সই ও সিলমোহর ব্যবহার করা, রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার ভুয়ো রিপোর্ট বানিয়ে অস্তিত্বহীন রোগীদের নামে প্যাকেজ বুক করা— এই পুরো চক্রে একাধিক অসৎ বেসরকারি নার্সিংহোম ও দালাল সংস্থার গভীর যোগসাজশ রয়েছে। আর এইভাবেই বিগত সরকারের আমলে রাজ্য সরকারের কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেছেন— স্বাস্থ্যসাথীর ডেটাবেস থেকে যত বেশি তথ্য আয়ুষ্মান ভারতের কেন্দ্রীয় সার্ভারে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, গরমিলের পাহাড় ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভুয়ো নথি, জাল আধার লিঙ্কিং এবং সরকারি অর্থের অবৈধ লেনদেনের প্রতিটি নথি এখন রাজ্য ভিজিল্যান্স ও আর্থিক অপরাধ দমন শাখার আতশকাচের নিচে। হুঁশিয়ারির সুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন— “অনেকেই ভাবছেন জলঘোলা করে পার পেয়ে যাবেন। তাঁদের জানিয়ে রাখি, দুর্নীতির ডায়েরির এটা সবে প্রথম পাতা খোলা হয়েছে, আসল অধ্যায়গুলো জনসমক্ষে আসা এখনও বাকি আছে!”
গরিব মানুষের চিকিৎসার নামে বরাদ্দ সরকারি তহবিলের ওপর এই নির্লজ্জ লুটপাটের পর্দাফাঁস হতেই রাজ্য রাজনীতিতে চরম শোরগোল পড়ে গিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার ভাগ কাদের পকেটে ঢুকেছিল, কারা এই ভূতুড়ে কার্ডের কারিগর— অডিট রিপোর্ট জমা পড়ার সাথে সাথেই সেই রাঘববোয়ালদের পাকড়াও করতে এবার বড়সড় আইনি পদক্ষেপের পথে এগোচ্ছে নবান্ন!
