স্কুলে স্কুলে যেমন সাড়ম্বরে বিদ্যাদেবী মা সরস্বতীর আরাধনা হয়, ঠিক তেমনই এবার থেকে রাজ্যের প্রতিটি থানায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে মা কালীর মূর্তি এবং ধুমধাম করে আয়োজন করতে হবে শ্যামাপূজার! বীরভূমের সিউড়ি থানার বিজয়া সম্মেলনীতে উপস্থিত হয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে প্রকাশ্যেই এই নজিরবিহীন আর্জি জানালেন রাজ্যের মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। শুধু আর্জি জানানোই নয়, নিজের এই প্রস্তাবের সপক্ষে ঐতিহাসিক রঘু ডাকাতের আখ্যান থেকে শুরু করে পুলিশ ও চোর— উভয়ের মানসিকতার অদ্ভুত উপমা টেনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এক চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি।
বুধবার সিউড়ি থানার অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় সোজাসাপটা ভাষায় জানান— শক্তি উপাসনার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত বীরভূম জেলার প্রতিটি থানায় মা কালীর পুজো হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ও ইতিবাচক। তিনি বলেন— “থানায় কালীপুজো হবে এবং মা কালীর মূর্তি থাকবে, এর মধ্যে কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ খোঁজার প্রয়োজন নেই। পুলিশ কার্যত শক্তিরই উপাসক। বাঙালিদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেমন সরস্বতী পুজোর একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি রয়েছে, ঠিক তেমনই থানার চিরাচরিত সংস্কৃতি হওয়া উচিত কালীপুজো। এটি পুলিশ বাহিনীকে ভেতর থেকে মানসিক বল ও শক্তি জোগাবে। এমনকি বীরভূমের মতো জেলা, যেখানে একাধিক সতীপীঠ বিরাজমান, সেখানে প্রতিটি থানায় কালীমূর্তি থাকা উচিত।”
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর উপমা টেনে আনেন মন্ত্রী। তিনি বলেন— “রঘু ডাকাতও কিন্তু ডাকাতি করতে বেরোনোর আগে শক্তি ও জয়ের প্রার্থনায় মা কালীর পুজো সেরে যেতেন। ঠিক যেমন কোনো হাসপাতালের সামনে ঈশ্বরের মূর্তি থাকলে ডাক্তার অপারেশনে ঢোকার আগে প্রণাম করেন এবং রোগীও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় মাথা ঠুকেন; ঠিক তেমনই থানাতেও কালীমূর্তি থাকা প্রয়োজন। এতে চোর যখন হাজতে ঢুকবে, সে মায়ের কাছে প্রার্থনা করবে যেন তাড়াতাড়ি ছাড়া পায়; আর পুলিশ যখন দুষ্কৃতীদের ধরতে রাতের অন্ধকারে রেডে বেরোবে, তখন তারাও মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করবে— মা, যাকে ধরতে যাচ্ছি সে যেন কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়!”
মন্ত্রীর এই প্রকাশ্য বয়ান সামনে আসতেই বিরোধীদের পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে তীব্র আক্রমণ ও রাজনৈতিক চাপানউতোর। রাজ্য সরকারের এমন অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার স্পষ্ট জানিয়েছেন— “কোনো পুলিশকর্মী বা সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত ধর্মাচরণে কারও আপত্তি থাকতে পারে না। একজন কালীভক্ত পুলিশকর্মী সারাদিন উপোস করে নিষ্ঠার সাথে ডিউটি করতেই পারেন এবং রাতে মাকে বেলপাতা দিয়ে উপোস ভাঙতেই পারেন। কিন্তু থানায় সরকারিভাবে কালীমূর্তি বসানো বা ধর্মাচরণের মতো সংবেদনশীল বিষয় থাকলে তা স্বরাষ্ট্র দপ্তর বা সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন বিচার বিবেচনা করবে; একজন মন্ত্রীর রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে এমন নিদান দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ধর্মের সাথে কর্ম ও জ্ঞান অর্জনের মেলবন্ধন না থাকলে সুস্থ সমাজ গঠন সম্ভব নয়।”
তবে এই ধর্মীয় বিতর্কের সমান্তরালেই শ্যামাপুজোকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক স্তরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে নবান্ন। বুধবারই রাজ্য মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক সেরেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। চোরবাগান মণ্ডপের মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোর উৎসব যাতে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে ও সুরক্ষাবিধি মেনে সম্পন্ন হয়, তার জন্য প্রতিটি জেলার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা তদারকির ভার সরাসরি মন্ত্রীদের কাঁধে বণ্টন করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বড় জেলাগুলির ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনজন মন্ত্রীকে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রাখা হচ্ছে।
থানার ভেতরে মা কালীর মূর্তি বসানোর এই নিদানকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বনাম সনাতন সংস্কৃতির টানাপোড়েন যেমন তুঙ্গে উঠেছে, তেমনই উৎসবের আবহে নবান্নের এই কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি প্রমাণ করে দিচ্ছে— কোনো বিতর্ককেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পথে বাধা হতে দিতে রাজি নয় রাজ্য সরকার!
