‘আচ্ছে দিন’, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ আর ‘বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি’—এমন নানা চটকদার প্রতিশ্রুতি ও গালভরা প্রচারের বেলুন এবার সপাটে ফুটো হয়ে গেল ভারতের সংসদ ভবনেই। প্রচার-সর্বস্ব কেন্দ্র সরকারের আসল ও কঙ্কালসার চেহারাটা একেবারে নগ্ন হয়ে সামনে এলো। গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদির জমানায় দেশের ঘাড় বিপুল ঋণের বোঝা চেঁপেছে, তার আসল তথ্য ফাঁস হলো সংসদে। বিজেপির তথাকথিত উন্নয়নের ঢাকঢোল পেটানোর আড়ালে ভারতের ঋণের পরিমাণ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ২০১ লক্ষ কোটি টাকায়! অর্থাৎ মোদি সরকারের ১২ বছরের শাসনে ঋণের বোঝা ৫৫ লক্ষ কোটি থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে একেবারে ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ পার করে গিয়েছে, যা ইউপিএ জমানার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি!
সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করেছেন, তা শুনে দেশবাসীর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভারতের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০১ লক্ষ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণই রয়েছে ১৯১ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ লাফিয়ে বেড়ে হয়েছে ৯ লক্ষ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি হলো, সরকারের দেওয়া তথ্যের সাথেই তাদের পেশ করা বাজেটের বিস্তর অমিল! গত ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে বাজেট পেশের সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন দাবি করেছিলেন, ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়ে থাকবে ১৯৭ লক্ষ ১৮ হাজার ১৬ কোটি টাকায়। অথচ বর্তমান তথ্য বলছে, অর্থমন্ত্রীর সেই হিসাব সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল! বাজেট পূর্বাভাসের চেয়েও আরও অতিরিক্ত ৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা চেপেছে দেশের মানুষের ওপর।
মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের শেষ অর্থবর্ষে (২০১৪-১৫) ভারতের মোট ঋণ ছিল মাত্র ৫৫.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা। সেখান থেকে গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদি একাই দেশের ঘাড় ১৪৬ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা চাপিয়েছেন! বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও এই ১২ বছরে পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার যদিও আত্মপক্ষ সমর্থনে দাবি করছে যে, এই বিপুল অর্থ দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো যেমন সড়ক, রেলপথ, বন্দর ইত্যাদিতে খরচ করা হয়েছে—কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, আকাশছোঁয়া ঋণ নেওয়া সত্ত্বেও কেন দেশের রেল থেকে সড়ক পরিকাঠামোর এমন কঙ্কালসার ও বেহাল দশা?
এদিকে, বাংলা যখন জনমুখী উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক প্রকল্প চালাতে ঋণ নেয়, তখন রাজ্য বিজেপি নেতারা রে-রে করে চেঁচাতে আসেন। অথচ মোদি সরকার দিনের পর দিন বাংলার কোটি কোটি টাকার বকেয়া আটকে রেখে রাজ্যকে বঞ্চিত করে চলেছে। সেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনার মুখে দাঁড়িয়েও সাধারণ মানুষের মুখে খাবার ও সামাজিক সুরক্ষা তুলে দিতে রাজ্য সরকারকে লড়াই চালাতে হয়। সংসদে সত্যি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মোদি সরকারের ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার ভণ্ডামি ও আসল ব্যর্থতা দেশবাসীর কাছে একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে।