বাংলার রাজনীতিতে এখন তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে তীব্র অস্থিরতা। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং নির্বাচন কমিশনে প্রতীক নিয়ে দাবি সব মিলিয়ে পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যে সংঘাত আরও প্রকাশ্যে আসে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির। উভয় পক্ষই দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকৃত পরিচয় নিয়ে দাবি জানায়। এরই মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের মূল নাম ও প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরের দিন দুই গোষ্ঠীকে আলাদা নাম ও প্রতীক দেওয়া হয় আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য।
তৃণমূলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী নিজেদের দলটির প্রকৃত প্রতিনিধি বলে দাবি করেছে। এই পরিস্থিতিতে কমিশন জানিয়েছে, বিরোধ মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কোনও পক্ষই মূল দলীয় নাম এবং সংরক্ষিত প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে দেওয়া হয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ফুটবল খেলোয়াড়ের প্রতীক। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী পেয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও খামের প্রতীক। প্রতীক বিতর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে বড় প্রশ্ন উঠছে, দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন শিবিরের হাতে থাকবে?
মদন মিত্রের দাবি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে সরানো নিয়ে যে অনুরোধ করা হয়েছিল, তা যদি মান্য করা হত তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হত না। গত জুনের পরাজয়ের পর কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্র শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান হোক। পরাজয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও উঠেছিল। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল অভিষেক বন্দোপাধ্যায়কে দল থেকে সরাতে হবে। তাহলে তৃণমূল অটুট থাকবে। এই দুই নেতা মমতাকে এই বিষয়ে জানিয়েছিলেন।মদন মিত্র স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্রস্তাব মমতা মানেননি। তাঁর মতে, অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও দল থেকে তাকে বহিস্কার করেননি মমতা।
তৃণমূলের অভ্যন্তরে এখন গভীর সংকট। প্রতীক হারানোর পর দলের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় যে দল গড়ে তুলেছিলেন, সেই দল এখন ভেঙে পড়ার মুখে। উপনির্বাচনে নিজের প্রার্থী তুলে নিয়ে কংগ্রেসের প্রতি সমর্থন জানানোকে অনেকেই রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন। মদন মিত্রের মন্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ। তিনি বলেছেন, অভিষেককে যদি সর্বভারতীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হত, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হত। জ্যেষ্ঠ নেতারা এখন দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ মনে করছেন, নেতৃত্বের অহংকারই দলকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। মমতা একসময় বাংলার রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য ছিলেন। এখন তিনি যেন সর্বহারা।