রাধাষ্টমীর পুণ্যলগ্নে বাগবাজারের শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গৌড়ীয় মঠ থেকে গোটা বাংলাকে এক অনন্য জাতীয়তাবাদী ঐক্যের ডাক দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! শনিবার সন্ধ্যায় রাধারানির ১০৭তম আবির্ভাব তিথির বর্ণাঢ্য মহোৎসবে উপস্থিত হয়ে তিনি কেবল ভক্তিভাবের প্রার্থনায় সামিল হলেন না, বরং রাজ্যকে ভাষা ও জাতপাতের নামে বিভক্ত করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এক জোরালো সনাতনী বার্তা তুলে ধরলেন। মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ কণ্ঠে রাজ্যবাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন— “ভাষা ও জাতের নামে কৃত্রিম ভেদাভেদ তৈরি করার লাগাতার চেষ্টা চলছে। এই বিভাজনের ফাঁদে কেউ পা দেবেন না; দিনের শেষে আমাদের একটাই আসল পরিচয়— আমরা সবাই ভারতীয়, আমরা সবাই হিন্দুস্তানি!”
বাগবাজারের পবিত্র গৌড়ীয় মঠে পৌঁছতেই মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক পরিবেশ। হরিনাম সংকীর্তনের সুরের মূর্ছনায় গর্ভগৃহের সামনে দাঁড়িয়ে রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহের সন্ধ্যারতিতে অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর মিশনের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষ পুষ্পস্তবক ও স্মারকে সম্মানিত করা হয়। গৌড়ীয় মঠের বর্তমান আচার্য ও সভাপতি শ্রীমদ্ ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী নিজে ঘুরে দেখেন সুসজ্জিত ‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মিউজিয়াম’। তাঁর সঙ্গে এই সফরে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী, বিধায়ক রীতেশ তেওয়ারি, অরিজিৎ বক্সী এবং উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপি সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ।
এই বিশেষ সন্ধ্যার অনুষ্ঠান থেকেই বাগবাজার গৌড়ীয় মঠের সার্বিক আধুনিকীকরণ ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতিতে একগুচ্ছ মেগা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন— এটি এমন এক পবিত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো প্রাতঃস্মরণীয় মহামানবের পদার্পণ ঘটেছিল। পূর্বতন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন— “বিগত সরকার এই রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাস মুছে ফেলতে হেরিটেজ কমিশনকেই তুলে দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে সেই ঐতিহ্যবাহী হেরিটেজ কমিশনকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। আর সেই হেরিটেজ কমিশনের তালিকায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ স্থানে জায়গা পেতে চলেছে বাগবাজারের এই গৌড়ীয় মঠ ও মন্দির।”
শুধু হেরিটেজ তকমাই নয়, রাজ্যের পর্যটন ও আধ্যাত্মিক মানচিত্রে বড় স্থান দিতে এবার বাজেটে ঘোষিত বিশেষ ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’-এর মধ্যেও এই শতাব্দী প্রাচীন মঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি।
মঠ চত্বর এবং সংলগ্ন এলাকার পরিবেশের মানোন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। মুখ্যমন্ত্রী জানান— মঠে যাতায়াতের সমস্ত রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ শুদ্ধ, পবিত্র ও সাত্ত্বিক রাখতে বিশেষ নজরদারি চালাবে কলকাতা পুরসভা ও কলকাতা পুলিশ। সেখানে একটি নতুন পরিকাঠামো প্রকল্প গড়ে তোলা হবে, যার জন্য কলকাতা পুরসভাকে যে মোটা অঙ্কের প্ল্যানিং ফি দিতে হতো, সনাতনী ভাবাবেগের কথা মাথায় রেখে সেই অর্থ পুরোপুরি মকুব করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়াও মঠ প্রাঙ্গণে ভক্তদের সুবিধার জন্য তৈরি হবে আধুনিক কার পার্কিং, সুপরিসর মাল্টিপারপাস অডিটোরিয়াম, বাংলার ঐতিহ্যবাহী খোল ও মৃদঙ্গ বাদন শেখার বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এবং বর্তমান কম্পিউটার সেন্টারটিকে আরও অত্যাধুনিক রূপ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে অসহায়দের জন্য ছাত্রাবাস ও বৃদ্ধাবাস গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যানও ঘোষণা করেন তিনি। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে ভারতের রাষ্ট্রবাদ ও সনাতন ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে রাধাষ্টমীর এই সন্ধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বাংলার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।