শুধুমাত্র দারিদ্র্য কমলেই কি ঘটছে দেশের সমৃদ্ধি? বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্টে সামনে এল ভারতের আয় ও জীবনযাত্রার বড় ফারাক!

বিশ্ব ব্যাঙ্কের ২০২৬ সালের Poverty and Inequality Platform বা PIP-এর তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভারত এবং আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলির মানুষের আয়স্তরের মধ্যে বড় ফারাক। PIP-তে বিভিন্ন দেশের আয় ও ভোগের বণ্টন নিয়ে বিস্তারিত তথ্য রাখা হয়।

ভারতের ক্ষেত্রে যে তুলনাটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, তা হল দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়ের মানুষের সীমা। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় করলেই ভারতের আয়ের নিরিখে শীর্ষ ১০ শতাংশের মধ্যে জায়গা পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, এই হিসেব অনুযায়ী দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের আয় ওই সীমার নীচে।

এবার ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে যদি উন্নত দেশগুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়। আমেরিকায় ধনীতম ১০ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দৈনিক আয়ের সীমা প্রায় ১৭৩ ডলার। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় তা প্রায় ১২৯ ডলার এবং জার্মানিতে প্রায় ১২৮ ডলার।

অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু কতজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে রয়েছেন, তা নয়। তার বাইরেও রয়েছে গোটা দেশের মানুষের গড় আয় এবং জীবনযাত্রার মান কতটা বাড়ছে, সেই বিষয়টি। বিশ্ব ব্যাঙ্কের PIP-তে দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের আয়-ভোগের বণ্টন পরিমাপ করা হয়।

এখানেই অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। একজন মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এলেন মানেই তিনি বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশের মধ্যবিত্ত বা উচ্চ আয়ের মানুষের সমান জীবনযাত্রায় পৌঁছে গেলেন—এমনটা নয়। দেশের ভিতরে আয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ব্যবধান থেকে যেতে পারে।

ভারতের ক্ষেত্রেও সেই ব্যবধানের বিষয়টিই আলোচনায় এসেছে। দারিদ্র্য কমানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের আয় যদি দেশের তুলনায় কিছুটা বাড়ে, তাতেই কি সামগ্রিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে? নাকি প্রয়োজন আরও বেশি উৎপাদনশীলতা এবং উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আয় বাড়াতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিমাণ জমি, শ্রম ও পুঁজি ব্যবহার করে যদি আরও বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়, তাহলে ব্যবসার পরিধি বাড়তে পারে। তার সঙ্গে তৈরি হতে পারে আরও বেশি এবং তুলনামূলক উচ্চ বেতনের কাজ।

এর জন্য প্রয়োজন নতুন ভাবনা ও উদ্ভাবনের সুযোগ, ব্যবসা শুরু এবং সম্প্রসারণের সহজ পরিবেশ, যুক্তিসঙ্গত করব্যবস্থা এবং অপ্রয়োজনীয় নিয়মকানুনের বোঝা কমানো।

অর্থাৎ ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জটা শুধু দারিদ্র্য কমানো নয়। দারিদ্র্য থেকে মানুষকে বের করে আনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষের আয় আরও বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের এই তুলনা তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে রাখছে—দারিদ্র্য কমেছে কি না, সেই হিসেবের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আয় কতটা বাড়ল, সেই প্রশ্নের উত্তরও কি এবার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *