২০২৬-এর ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে পর্যুদস্ত করে বাংলায় সরকার গঠন, তার পর উপনির্বাচনের জোড়া কেন্দ্রে বিপুল জয়— আর এবার রাজ্যের বিচারবিভাগীয় অঙ্গন তথা আইনজীবী সমাজেও উড়ল বিজেপির বিজয়পতাকা! দীর্ঘদিনের তৃণমূলী একাধিপত্য চুরমার করে দিয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বার কাউন্সিলের অফিস বেয়ারার নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়যুক্ত হলো ভারতীয় জনতা পার্টির তিন প্রার্থী। নতুন সভাপতি নির্বাচিত হলেন বিশিষ্ট আইনজীবী সমীর পাল। বিধানসভা ও উপনির্বাচনের পর খাস বার কাউন্সিলেও বিরোধীদের এই ভরাডুবি প্রমাণ করে দিল— পরিবর্তনের হাওয়া কেবল রাজনৈতিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, সমাজের প্রতিটি প্রভাবশালী পেশাদার স্তরেই আজ থাবা বসিয়েছে গেরুয়া ঝড়!
ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বার কাউন্সিলের অফিস বেয়ারার নির্বাচনে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ প্যানেলকে রীতিমতো কোণঠাসা করে দেন বিজেপি সমর্থিত প্রার্থীরা। সভাপতি পদে সমীর পাল ১৮-৮ ভোটের সুস্পষ্ট ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেন। অন্যদিকে সহ-সভাপতি পদে ১৭-৯ ভোটে জয়ী হয়েছেন অজয় চৌবে। পাশাপাশি বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া বা বিসিআই-এর প্রতিনিধি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ১৭-৯ ভোটে জয়লাভ করেছেন অরুণ সরকার। তাঁকে এবার জাতীয় স্তরে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি পদেই বিরোধীদের কার্যত পর্যুদস্ত করে এই একতরফা জয় তুলে নিয়েছে বিজেপি।
এই ঐতিহাসিক জয়ের খবর আসতেই নিজে ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বার কাউন্সিলের কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিজয়ী প্রার্থীদের উত্তরীয় পরিয়ে ও মিষ্টিমুখ করিয়ে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তিনি। বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকেও মুখ্যমন্ত্রীকে আন্তরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সেখানে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ খোঁচা দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান— বিধানসভা নির্বাচনের আগেই বার কাউন্সিলের মূল সদস্য নির্বাচন হয়েছিল। আর বিধানসভা ভোটের গণনার পর তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল ভুয়ো দাবি করেছিল যে তারাই নাকি এই নির্বাচনে জিতেছে! কিন্তু আজ অফিস বেয়ারার নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ পেতেই দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে গেল। তৃণমূলের সেই দাবি যে কতখানি অন্তঃসারশূন্য ও বিভ্রান্তিকর ছিল, তা আজ আইনজীবী সমাজের প্রকাশ্য গণম্যান্ডেটেই প্রমাণিত হয়ে গেল। উল্লেখ্য, এতদিন এই গুরুত্বপূর্ণ বার কাউন্সিল ছিল তৃণমূলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে এবং এর চেয়ারম্যান পদে আসীন ছিলেন তৃণমূলের প্রভাবশালী বিধায়ক অশোক দেব।
মুখ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেছেন যে, পুজোর ছুটির পর আদালত ও প্রশাসনিক কাজকর্ম স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলেই বার কাউন্সিলের নবনির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবেন তিনি। বর্তমানে রাজ্য বার কাউন্সিলে এক হাজারেরও বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষা এবং আইনজীবীদের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য নতুন ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা হবে।
পঞ্চায়েত স্তরের গ্রামীণ ক্ষমতা থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের বুদ্ধিজীবী আইনজীবীদের মঞ্চ— সর্বত্র একের পর এক তৃণমূলের দুর্গ গুঁড়িয়ে বিজেপির এই নিরঙ্কুশ জয় স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বাংলায় ক্ষমতা পরিবর্তনের অভিঘাত এখন সমাজের সর্বস্তরে এক অমোঘ বাস্তবতা!