ঐতিহাসিক পরিবর্তনের হাত ধরে বাংলায় রাষ্ট্রবাদী সরকার প্রতিষ্ঠার পর দলের অন্দরে কোনো ধরনের অহংকার, বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম যে বরদাস্ত করা হবে না— সেই বিষয়ে দলের নিচুতলার নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য! ক্ষমতা পাওয়ার পর অনেক সময় দলের ভেতরে নব্য ও সুযোগসন্ধানীদের অনুপ্রবেশ ঘটে, যা দলের মূল নীতি ও ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করে। সেই বিপদ আঁচ করেই কোচবিহারের মাটিতে দাঁড়িয়ে মণ্ডপ ও জেলা কোর কমিটির নেতাদের এক কড়া নির্দেশিকা ধরিয়ে দিলেন রাজ্য সভাপতি। সাফ বার্তা দেওয়া হয়েছে— যেকোনো স্তরেই হোক না কেন, দুর্নীতির সামান্যতম গন্ধ মিললেই রেয়াত করা হবে না কাউকেই; বরদাস্ত করা হবে না কোনো ধরনের দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ!
বুধবার কোচবিহারে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জোড়া গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন শমীক ভট্টাচার্য। প্রথমে মণ্ডল স্তরের সভাপতি ও পদাধিকারীদের নিয়ে এবং পরবর্তীতে জেলা বিজেপির কোর কমিটি ও দলীয় বিধায়কদের সাথে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করেন তিনি। এই দুই পর্বের বৈঠকেই অত্যন্ত রাশভারী মেজাজে তিনি স্পষ্ট জানান— পশ্চিমবঙ্গে দল এই প্রথমবার সরকার গঠন করেছে। তাই এই ক্ষমতার অলিন্দে দাঁড়িয়ে কোনো নেতা বা কর্মী যেন ভুলে না যান যে, ত্যাগের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আজ এই সাফল্য এসেছে। ক্ষমতার মোহে আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে দলের অস্তিত্বে আঘাত করা।
বিশেষ করে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাতারাতি যারা গেরুয়া উত্তরীয় গায়ে চাপিয়ে ‘উগ্র বিজেপি’ সাজছে, তাদের বিষয়ে কড়া নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রাজ্য সভাপতি সতর্ক করে বলেন— বিগত সরকারের সংস্কৃতি থেকে আসা এক শ্রেণির সুবিধাবাদী উপাদান দলের জেলা নেতাদের তোয়াজ করে এবং উত্তরীয় পরিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এদের কারণেই বিভিন্ন স্থানে অনভিপ্রেত সংঘাত ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিচ্ছে, যার ফলে কোণঠাসা হচ্ছেন দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পুরনো কর্মীরা। এই নব্য সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করে দলীয় পরিকাঠামো থেকে দূরে রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দেন তিনি।
সাংগঠনিক বৈঠকের পরেই দলীয় কর্মীদের সেবামূলক কাজে ব্রতী হওয়ার ডাক দিয়ে কোচবিহার রাসমেলার মাঠে এক ঐতিহাসিক ‘সেবাজ্যোতি যাত্রা’র সূচনা করেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। হাতে প্রজ্বলিত মশাল তুলে নিয়ে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে পদযাত্রা করেন তিনি। তাঁর সাথে পা মেলান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকও।
অন্যদিকে একই দিনে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটেও এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে সূচিত হয় এই মশাল পদযাত্রা। বালুরঘাট থানা মোড় থেকে মশাল জ্বালিয়ে ‘সেবাজ্যোতি যাত্রা’র নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তথা বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদার। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক বিদ্যুৎকুমার রায়। মিছিল থেকে সুকান্ত মজুমদার দেশ গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলেন— “গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রূপান্তরের যে যাত্রা শুরু করেছিলেন মোদীজি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ দেশকে সেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর দেখানো সেবার পথেই আত্মনির্ভর ও বিকশিত ভারত গড়ে উঠবে।”
কোচবিহার থেকে বালুরঘাট— জোড়া সাংগঠনিক ও জনমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্য নেতৃত্ব স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে, বাংলায় ক্ষমতায় এলেও বিজেপি কোনো সনাতনী রাজনৈতিক দল নয় যেখানে ক্ষমতার দম্ভ জায়গা পাবে। বরং কঠোর শৃঙ্খলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং নিঃস্বার্থ সমাজসেবাই হবে দলের আসল চালিকাশক্তি!