ক্ষমতা হারানোর পর জেলায় জেলায় ঘুরে সংগঠনকে চাঙ্গা করতে নেমেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু প্রথম সভাতেই যে এমন চরম লজ্জাজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে, তা হয়তো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি আলিমুদ্দিন বা কালীঘাটের রাজনীতির কারবারিরা! হুগলির রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শ্রীরামপুরের কোর্ট মাঠে আয়োজিত হয়েছিল বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুচর্চিত মেগা জনসভা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো এক করুণ চিত্র! বিকেল গড়িয়ে যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মাইক হাতে বক্তব্য রাখতে উঠলেন, তখন মাঠের অর্ধেকেরও বেশি চেয়ার সম্পূর্ণ ফাঁকা! সাধারণ মানুষের অনুপস্থিতিতে সেই খাঁ খাঁ করা মাঠের ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
মমতার এই চরম ফ্লপ শো নিয়ে স্বভাবসুলভ ঝাঁঝালো মেজাজে তীব্র কটাক্ষে মেতেছে রাজ্য বিজেপি। বিজেপির আইটি সেল ও বিরোধী নেতৃত্ব শ্রীরামপুরের কোর্ট মাঠের খাঁ খাঁ করা শূন্য চেয়ারের ছবির পাশে ব্যারাকপুরের বিখ্যাত ‘দাদা বৌদি বিরিয়ানি’র দোকানের সামনে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক লাইনের ছবি পাশাপাশি বসিয়ে চরম ব্যঙ্গ ছুড়ে দিয়েছে। বিজেপির স্পষ্ট কটাক্ষ— “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিথ্যে ভাষণ শোনার চেয়ে মানুষ ব্যারাকপুরের দাদা বৌদির দোকানে বিরিয়ানি কিনতে বেশি ভিড় জমাচ্ছেন!” যে নেত্রীর এক ডাকে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামত বলে দাবি করা হতো, ক্ষমতা ও দলীয় প্রতীক হাতছাড়া হতেই তাঁর সভায় মাছি তাড়ানোর এমন দৃশ্য বাংলার রাজনীতির স্পষ্ট পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে।
এদিকে সভায় চরম বিশৃঙ্খলা ও মানুষের অনুপস্থিতি দেখে প্রকাশ্য মঞ্চ থেকেই চরম মেজাজ হারাতে দেখা গেল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। লোক না আসার দায় নিজের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে একের পর এক আজব ও হাস্যকর অজুহাত খাড়া করতে শুরু করেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি— গতকাল রাত থেকেই নাকি পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে কর্মীদের হুমকি দিয়েছে যাতে কেউ সভায় না আসে! এমনকি জিটি রোড সহ সমস্ত সংযোগকারী রাস্তায় ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করে রাখা হয়েছে এবং ড্রোন উড়িয়ে নাকি তাঁর সমর্থকদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে! মাঠের কাদার কথাও উল্লেখ করতে ভোলেননি তিনি।
শ্রীরামপুরের সভায় দাঁড়িয়ে হতাশা ঢাকতে গিয়ে পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে প্রকাশ্যেই হুমকির সুরে আক্রমণ শানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আজ উত্তরপাড়ায় আসার পথে আমাদের বিধায়ক কুণাল ঘোষের গাড়িতে হামলা হয়েছে। পুলিশকর্মীদের বলব— নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন। রক্ষক হয়ে ভক্ষক হবেন না! মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমনই কে কী করছেন তার সমস্ত রেকর্ড রাখা হচ্ছে। সময় বদলালে কিন্তু এই লুম্পেনদের আর পাশে পাবেন না, আপনাদের চরম সমস্যায় পড়তে হবে!”
এখানেই শেষ নয়, নিজের দলীয় আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে মমতা অভিযোগ করেন— তাঁকে নাকি গৃহবন্দি করে রাখা হচ্ছে এবং আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁকে এই সভায় আসতে হয়েছে। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “এখন হানিমুন পিরিয়ড নয়, মানিমুন পিরিয়ড চলছে! মনে রাখবেন দিল্লি টলমল, পাপ বাপকেও ছাড়ে না আর ধর্মের কল বাতাসে নড়ে!” তবে রাজনৈতিক মহলের মতে— পুলিশের ওপর দোষ চাপিয়ে বা দিল্লিকে নিশানা করে আসল সত্য ঢাকা যাবে না। শ্রীরামপুরের জনশূন্য কোর্ট মাঠ স্পষ্ট প্রমাণ করে দিল— বাংলার আমজনতা মিথ্যে প্রতিশ্রুতির রাজনীতিকে বর্জন করে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে!
