পশ্চিমবঙ্গে বিগত দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় শাসনব্যবস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলাকে কীভাবে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল এবং খাকি উর্দির আড়ালে অপরাধের সাম্রাজ্য চালানো হতো, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির সাম্প্রতিক চার্জশিটে তা এক নারকীয় ও চাঞ্চল্যকর সত্য হিসেবে সামনে এসেছে। জমি কেলেঙ্কারি এবং তোলাবাজির তদন্তে নেমে ইডি এখন কালীঘাট থানার প্রাক্তন ওসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের যে ভয়ঙ্কর ও প্রভাবশালী ভূমিকা খুঁজে পেয়েছে, তা খোদ কলকাতা পুলিশের অন্দরেই এক বিরাট কম্পন সৃষ্টি করেছে।
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আশীর্বাদধন্য হওয়ার সুবাদে এই সামান্য ও নিম্নপদস্থ পুলিশকর্মী রাতারাতি ক্ষমতার এমন এক চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, যেখানে খোদ কালীঘাট থানার ওসির অফিস ঘরটি কোনো আইনি কাজের ঠিকানা না হয়ে, হয়ে উঠেছিল বড় বড় অপরাধের বিজনেস ডিল এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের একমাত্র গোপন ডেরা। ইডির পেশ করা মেগা চার্জশিটে কলকাতা পুলিশেরই একজন কর্মরত ইনস্পেক্টরের গোপন বয়ান উদ্ধৃত করে শান্তনুর এই বেপরোয়া তোলাবাজি সিন্ডিকেটের পুরো ব্লু-প্রিন্টটি ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী, শান্তনুর ওসির ঘরে অধস্তন সাধারণ পুলিশ কর্মীদের ঢোকার ক্ষেত্রে এক অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল, কারণ সেখানে দিন-রাত আনাগোনা চলত জয় কামদারের মতো কুখ্যাত প্রোমোটার, দালাল ও ফড়েদের। অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয় হলো, এক লড়াকু ও সৎ পুলিশ আধিকারিকদের বঞ্চিত করে এই ওসির ঘরেই দালালদের সাথে বসে গোটা কলকাতা পুলিশের বদলি বা ট্রান্সফারের ফাইনাল তালিকা তৈরি হতো।
কেবল তাই নয়, পুলিশের ওয়েলফেয়ার কমিটি এবং কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের ওপর শান্তনুর এই একছত্র দাদাগিরিকে কাজে লাগিয়ে চলত এক পরিকল্পিত লুণ্ঠন। ইডির কাছে দেওয়া এক সাব-ইনস্পেক্টরের বয়ান অনুযায়ী, শান্তনু সিনহা বিশ্বাস অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রতিটি থানা এবং বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোতে সুভেনিয়ার বা স্যুভেনির পাঠানো শুরু করেন এবং তার আড়ালে জোরপূর্বক থানা পিছু ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং কর্পোরেটদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের তোলা নগদ ও চেকে সংগ্রহ করতেন। কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের নিয়োগ থেকে শুরু করে বোর্ড নির্বাচন—সবটাই চলত এই দুর্নীতিবাজ ওসির নির্দেশে, যার কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস কারও ছিল না। তো তোষণ ও দুর্নীতির এই নোংরা জমানা শেষ করে, খাকি উর্দির পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে এবং শান্তনুর মতো তোলাবাজদের জেলের গরাদে ঢোকাতে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই আপোষহীন ও পরিচ্ছন্ন অ্যাকশন সত্যিই এক দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ভারতের অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।
