রাজনৈতিক স্বার্থে উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি উসকে দেওয়ার যে বিপজ্জনক চক্রান্ত দেশজুড়ে শুরু হয়েছে, তার বলি হলেন খড়্গপুরের অতিরিক্ত এসপি ড. বুশরা বানো। মাত্র আড়াই মাস আগে দায়িত্ব পাওয়া ২০২১ ব্যাচের এই তুখড় মহিলা আইপিএস আধিকারিককে রাতারাতি পদাবনতি ঘটিয়ে রাজ্য পুলিশের সশস্ত্র বাহিনীর চতুর্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ডান্ট পদে বদলি করা হয়েছে। সরকারি নথিতে একে ‘সামান্য রদবদল’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলেও, আসল ঘটনা উন্মোচিত হতেই বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। ‘হিন্দু লিগাল ফান্ড’ নামে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সোশাল মিডিয়ায় তোলা বায়না ও আপত্তির সামনে যেভাবে প্রশাসন হাঁটু মুড়ে দিল, তাতে স্পষ্ট যে ক্ষমতাশালী বিজেপি অনুগামী এই সংগঠনগুলির চাপের কাছে আইনি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত বুশরা বানোর একটি ব্যক্তিগত ভিডিও বার্তার মাধ্যমে, যেখানে তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার জন্য নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোচিং আকাদেমি কীভাবে তাঁর সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। একটি প্রথম সারির কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসার পাশাপাশি ভিডিওর শুরুতে ও শেষে সাধারণ সৌজন্যমূলক শব্দ যেমন ‘আস-সালাম আলাইকুম’ বা ‘ইনশাল্লাহ’ বলা নিয়েই আপত্তি তোলে ওই উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটি। তারা ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে প্রশ্ন তোলে কেন ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’ বলা হলো না! আর সেই উগ্র ধর্মীয় উসকানিমূলক বার্তার পরই তড়িঘড়ি ১৪ সেপ্টেম্বর বদলির নির্দেশিকা জারি করে নবান্ন।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বিজেপি নেতারা নিজেরা যখন দিনরাত সরকারি কর্মসূচি ও সাংবিধানিক মঞ্চে নিজেদের ধর্মীয় প্রতীক এবং উগ্র নীতি নিয়ে প্রচার করেন, তখন তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অথচ একজন সফল মহিলা আধিকারিক ছাত্রছাত্রীদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার সময় সাধারণ কোনো শব্দ ব্যবহার করলেই উগ্র বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে, আর প্রশাসনও সেই অপপ্রচারের সামনে মাথা নত করে দেয়। পরীক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা কোনো সরকারি আদেশ বা নির্দেশিকা নয়, সেখানে ব্যবহৃত সাধারণ সম্বোধনকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে তোপ দাগা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
যে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় দেশজুড়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অসংখ্য সফল প্রার্থী উপহার দিয়েছে, সেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে এবং একজন উচ্চশিক্ষিত মহিলা আইপিএসকে কেবল উগ্র ধর্মীয় মেরুকরণের স্বার্থে টার্গেট করা হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী বাহিনীর এমন অগণতান্ত্রিক খবরদারির কাছে নতিস্বীকার করে একজন যোগ্য প্রশাসনিক আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে যে, সমাজে এখন আর কাজের যোগ্যতার মূল্য নেই, বরং উগ্র রাজনীতির পকেট ভার করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই উগ্র হিন্দুত্ববাদের সামনে ব্যাকফুটে না গিয়ে, একজন যোগ্য ও সৎ আধিকারিকের অধিকার এবং প্রশাসনিক স্বাধীনতার রক্ষায় সমস্ত স্তরের মানুষের সোচ্চার হওয়া উচিত। ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় মেরুকরণের এই নোংরা রাজনীতি বন্ধ না হলে আগামী দিনে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ ধসে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞ মহল। একজন প্রশাসনিক আধিকারিককে কেবল ধর্মীয় আস্ফালনের শিকার হতে দেখে চুপ থাকা মানেই এই উগ্র ফ্যাসিবাদী চক্রান্তকে পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়া, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার।
