রাজ্যে ক্ষমতার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটতে না ঘটতেই এবার তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বীরভূমের মাটিতেও শুরু হয়ে গেল ঘাসফুলের বিরাট বিপর্যয়! রামপুরহাট-১ ব্লকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খরুন গ্রাম পঞ্চায়েতে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকে গোহারা হারিয়ে পঞ্চায়েতের সম্পূর্ণ রাশ নিজেদের কবজায় নিল ভারতীয় জনতা পার্টি। টানটান উত্তেজনা ও কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে এই পঞ্চায়েতের নতুন প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপির হরেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং উপপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল। অনুব্রতর জেলা হিসেবে পরিচিত বীরভূমের পঞ্চায়েত হাতছাড়া হতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চরম আলোড়ন।
ফিরে আসা যাক খরুন গ্রাম পঞ্চায়েতের সেই পেছনের সমীকরণে। মোট ১৩টি আসন বিশিষ্ট এই পঞ্চায়েতে শেষ ত্রিস্তর নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৭টি আসন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির দখলে গিয়েছিল ৬টি আসন। সংখ্যাতত্ত্বে মাত্র এক আসনে এগিয়ে থাকার সুবাদে সেবার প্রধানের কুর্সি দখল করেছিল তৃণমূল এবং প্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন সুমিত্রা লেট। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই গ্রামীণ স্তরে উলটপুরাণ শুরু হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন প্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার জোর তৎপরতা শুরু করে বিজেপি। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ প্রতিকূল এবং হাতছাড়া হতে চলেছে বুঝতে পেরে ভোটাভুটির আগেই তড়িঘড়ি পদত্যাগপত্র জমা দেন তৃণমূল প্রধান সুমিত্রা লেট।
প্রধান পদ শূন্য হওয়ার পর বুধবার প্রশাসনিক নির্দেশে নতুন প্রধান ও উপপ্রধান নির্বাচনের লক্ষ্যে ডাকা হয়েছিল আস্থা ভোটাভুটি। কোনো ধরনের হিংসা বা অপ্রীতিকর ঘটনা আটকাতে গোটা পঞ্চায়েত দফতর ঘিরে ফেলেছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী। নিশ্ছিদ্র পুলিশি পাহারার মধ্যেই ভোটপ্রক্রিয়ায় অংশ নেন পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যরা।
আর সেই ভোটাভুটিতেই ঘটে গেল সবচেয়ে বড় নাটকীয় পটবদল! বিজেপির প্রধান পদপ্রার্থী হরেন্দ্রনাথ মণ্ডলের পক্ষে ভোট পড়ে মোট ৮টি। অর্থাৎ, খাতায়-কলমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন ধরে এবং দলীয় সদস্যরা বিজেপির পক্ষে ক্রস ভোটিং করেন। এর ফলেই ম্যাজিক ফিগার ৭ পার করে ৮ সদস্যের বিপুল সমর্থন নিয়ে পঞ্চায়েতের দখল নিশ্চিত করে গেরুয়া শিবির।
ফলাফল প্রকাশ্যে আসতেই পঞ্চায়েত ভবনের বাইরে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন উপস্থিত বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। সবুজকে বিদায় জানিয়ে গোটা এলাকা ঢেকে যায় গেরুয়া আবিরের বন্যায়। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের স্পষ্ট বক্তব্য— দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতেই তৃণমূলের সদস্য ও সাধারণ মানুষ আজ বিজেপির নেতৃত্বে আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, হাত থেকে একের পর এক পঞ্চায়েত খসে পড়ায় বীরভূম জেলা তৃণমূলের অন্দরে তীব্র অন্তর্কলহ ও চরম অস্বস্তি এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
