১ জুলাই, জাতীয় চিকিৎসক দিবস। দেশজুড়ে যখন চিকিৎসকদের অবদানকে সম্মান জানানো হচ্ছে, তখন এক বুক চাপা কান্না আর এক লড়াকু অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার এক সাধারণ পরিবার। মাত্র দুই বছর আগেও এই বিশেষ দিনটিতে যিনি গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে, আরজি কর হাসপাতালের শত শত রোগীর মুখে হাসি ফোটাতেন, আজ তিনি শুধুই স্মৃতি।
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে জুলাই পার হলেই আসবে সেই অভিশপ্ত অগাস্ট মাস, আর ৮ ও ৯ অগাস্টের সেই নারকীয় রাত মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দিয়েছিল এক মেধাবী তরুণী চিকিৎসকের জীবন। মেয়ে আজ আর নেই, কিন্তু তার ফেলে যাওয়া সেই প্রথম স্টেথোস্কোপ আর হাতের ঘড়িটা আজও পরম যত্নে, বুকের গভীরে আগলে রেখেছেন মা রত্না দেবনাথ। অভাবের চরম সংসারের মধ্যেও যে মেয়ে কোনোদিন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে মরে যেতে দেয়নি, দিন-রাত এক করে অসম্ভব কষ্টের মধ্যে পড়াশোনা করে যে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছিল, আজ এই বিশেষ দিনে তাকে আরও বেশি করে মনে পড়ছে মা-বাবার।
পানিহাটির বর্তমান বিধায়ক তথা অভয়ার মা রত্না দেবনাথ অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান যে, তাঁর স্বামী অত্যন্ত কষ্ট করে মেয়ের জন্য প্রথম স্টেথোস্কোপটি কিনে এনেছিলেন। মেয়ে সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকত, অন্য কোনো দিকে তার মন ছিল না। আজ মা বিধায়ক হয়েছেন, কিন্তু মেয়ে পাশে থাকলে যে আনন্দ হতো, তা আজ কোথাও একটা অপূর্ণ রয়ে গেছে। শুধু মা-বাবাই নন, মেয়ের সেই বিশেষ বন্ধুও আজও এই পরিবারের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, প্রতি বছর এই দিনে সে ফোন করে খোঁজ নেয় মা-বাবার।
আরজি করের সেই নৃশংস কাণ্ডে আসল দোষী কে বা কারা, সেই অন্ধকার রাতে ঠিক কী ঘটেছিল এক জনসেবকের সাথে— রাজ্য তথা দেশ তোলপাড় করা এই ঘটনার বহু প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পর এই মামলার ধুলো জমা ফাইল নতুন করে খোলা হয়েছে এবং এক সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই তদন্তের ওপর ভরসা রেখেই আজও প্রতিটি মুহূর্ত চাতক পাখির মতো দিন গুনছেন অভয়ার মা-বাবা। ও
ছাব্বিশের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে লড়ে জয়ী হওয়ার পর রত্না দেবনাথ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর এই রাজনৈতিক ময়দানে আসা কোনো ক্ষমতার লোভে নয়, বরং স্রেফ নিজের মেয়ের সুবিচারের আশায়। ভোটের ময়দানে এবং তার পরবর্তী সময়েও বহু কটাক্ষ আর কুৎসিত আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে এই পরিবারকে। আজও নানাভাবে তাঁদের পিছনে লাগার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাঁদের জীবনযাত্রা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত বাধার মুখে দাঁড়িয়েও অভয়ার মায়ের স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ জবাব— তাঁদের কোনো টাকা-পয়সা কিংবা বড় বাড়ির লোভ নেই, তাঁরা শুধু চান প্রকৃত অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি। এই লড়াই শুধু তাঁদের নিজেদের মেয়ের জন্য নয়, বরং বাংলার বুকে আর কোনোদিন যাতে কোনো চন্দনা, রেখা বা অভয়াকে এমন নৃশংসতার শিকার হতে না হয়, কোনো ডাক্তারকে যাতে কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারাতে না হয়— সেই সুরক্ষিত পরিবেশের স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। সমস্ত বাধা আর সামাজিক কটাক্ষকে উপেক্ষা করে এই মা-বাবা আজও বিশ্বাস করেন, একদিন সমস্ত সত্যি জনসমক্ষে আসবেই এবং তাঁদের মেয়ে প্রকৃত বিচার পাবে।