দেশের সরকারি সম্পত্তি ও খনিজ সম্পদ আত্মসাৎকারী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এবার এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। নাগপুর জেলার ডুমরি খুর্দ রেল সাইডিং থেকে অত্যন্ত উচ্চমানের এবং মূল্যবান কয়লা সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাৎ ও কালোবাজারে পাচার করার এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি সামনে এসেছে। এই জঘন্য দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের একটি কুখ্যাত বেসরকারি অংশীদারী সংস্থা এবং দক্ষিণ পূর্ব মধ্য রেলওয়ের বা এসইসিআর-এর বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় আধিকারিক ও কর্মীর বিরুদ্ধে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এফআইআর দায়ের করেছে সিবিআই-এর দুর্নীতি দমন শাখা।
প্রাথমিক তদন্তের পর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা স্পষ্ট জানতে পেরেছে যে, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং কোনো রকম সরকারি অনুমতি ছাড়াই ওই নির্দিষ্ট সংস্থাটি রেল সাইডিং থেকে উন্নত মানের কয়লা অবৈধভাবে সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এই কোটি কোটি টাকার কয়লা চুরির ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ২৯ লক্ষ টাকারও বেশি মূল্যের সরকারি সম্পত্তি সরাসরি আত্মসাৎ করার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
সিবিআই-এর এফআইআর এবং গোপন সূত্রের খতিয়ান অনুযায়ী, এই মারাত্মক অভিযুক্ত বেসরকারি সংস্থাটির মালিকের নাম অমিত মাইতি, যার বাড়ি এই পশ্চিমবঙ্গেই। এই সংস্থাটি আসলে ওয়েস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের লিজ নেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ডুমরি খুর্দ রেল সাইডিংয়ে খোলা মালবাহী ওয়াগন পরিষ্কার করা, রেললাইন ঝাড়ু দেওয়া এবং কয়লা হ্যান্ডলিংয়ের মতো চুক্তিভিত্তিক কাজ করত।
সরকারি নিয়ম ও চুক্তি অনুযায়ী, এই সংস্থাটির কাজ ছিল শুধুমাত্র রেললাইনের ধারে পড়ে থাকা প্রত্যাখ্যাত বা রিজেক্টেড বর্জ্য কয়লা ও আবর্জনা পরিষ্কার করা। কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে এবং দক্ষিণ পূর্ব মধ্য রেলওয়ের কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের সাথে এক নোংরা যোগসাজশ ও সিন্ডিকেট গড়ে তুলে, এই সংস্থাটি বর্জ্য কয়লা সরানোর আড়ালে রেল সাইডিং থেকে অত্যন্ত উন্নত ও মহার্ঘ G-12 গ্রেডের আসল কয়লা গোপনে সংগ্রহ করে তা চড়া দামে খোলা বাজারে পাচার করে দিতে শুরু করে।
এই চরম জালিয়াতির পর্দা ফাঁস হয় চলতি বছরের ২১ মে, যখন নাগপুরে রেলওয়ের ভিজিল্যান্স বিভাগের একটি বিশেষ দল কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ওই রেল সাইডিংয়ে এক আকস্মিক ও ঝটিকা পরিদর্শন চালায়। সেই সময় রেল সাইডিংয়ে প্রায় ১,৪২৭ মেট্রিক টন উচ্চমানের কয়লা অবৈধভাবে জমা অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে উদ্ধার হওয়া সেই সমস্ত কয়লার রাসায়নিক নমুনা পরীক্ষার জন্য নাগপুরের মর্যাদাপূর্ণ সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড ফুয়েল রিসার্চ বা সিআইএমএফআর-এ পাঠানো হলে, ল্যাবরেটরি রিপোর্টে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত করা হয় যে, উদ্ধার হওয়া কয়লা কোনো বর্জ্য নয়, বরং তা অত্যন্ত দামি G-12 গ্রেডের আসল খনিজ কয়লা।
সিবিআই-এর এফআইআর আরও জানাচ্ছে যে, অভিযুক্ত সংস্থাটি গত ২১ মার্চ এবং ২৪ মার্চ—মাত্র এই কয়েকদিনের ব্যবধানে মোট ১৮টি ভুয়ো গেট পাস ব্যবহার করে প্রায় ৭২০ মেট্রিক টন উন্নত মানের কয়লা সরাসরি সাইডিং থেকে গায়েব করে বাইরে পাচার করে দিয়েছিল। এই পুরো চক্রে রেল আধিকারিকদের ভূমিকাও এখন তীব্র সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের ধারায় মামলা দায়ের করে সিবিআই ইতিমধ্যেই সমস্ত গেট পাস ও ডিজিটাল নথি বাজেয়াপ্ত করেছে এবং এই কয়লা মাফিয়া চক্রের আর্থিক লেনদেনের মূল শিকড় খুঁজতে তদন্ত আরও জোরদার করেছে। তো দেশের সম্পদ লুটেরাদের রেয়াত না করে, দুর্নীতিগ্রস্তদের ঘাড় ধরে জেলের গরাদে ঢোকাতে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই আপোষহীন ও পরিচ্ছন্ন অ্যাকশন সত্যিই এক দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ভারতের অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে
