বিগত সরকারের আমলে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলাকে কার্যত দলীয় কার্যালয়ের অঙ্গুলীহেলনে চালানোর যে অভিযোগ উঠত, তার কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে এক বিতর্কিত নাম— সিভিক ভলান্টিয়ার! কখনো প্রকাশ্য তোলাবাজি, কখনো ট্রাফিকের নামে বেআইনি ঘুষ, এমনকি খুন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রেও বারবার কাঠগড়ায় উঠেছে এই সিভিক বাহিনীর কিছু অংশের নাম। যার জেরে সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমাগত কালিমালিপ্ত হয়েছে খোদ পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এবার সেই বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত সিভিক রাজের ওপর চরম কুঠারাঘাত করতে এক অভূতপূর্ব ও কঠোর নির্দেশিকা জারি করল কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজার!
লালবাজারের তরফে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— আইন সবার জন্য সমান, আর সিভিক ভলান্টিয়াররা কোনো অবস্থাতেই আইনের ঊর্ধ্বে নন। সিভিকদের কাজের নির্দিষ্ট গণ্ডি ও আচরণ বেঁধে দিতে তৈরি করা হয়েছে কড়া স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা এসওপি। নয়া নির্দেশিকায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— তোলাবাজি, ঘুষ নেওয়া কিংবা যেকোনো ধরনের অসামাজিক ও বেআইনি কার্যকলাপে কোনো সিভিকের নাম জড়ালে এক চুলও রেয়াত করা হবে না। কোনো সিভিকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়ামাত্রই কালবিলম্ব না করে আগে তাকে কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়া হবে। পরবর্তীতে বিভাগীয় তদন্তে যদি দোষ প্রমাণিত হয়, তবে এক মুহূর্তের মধ্যে তাকে স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে!
শুধু শাস্তি নয়, সিভিকদের মানসিকতা বদলাতে এবার লালবাজারের অধীনে থাকা প্রায় দশ হাজার সিভিককে দেওয়া হবে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনুশাসনের কড়া পাঠ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ঠিক কী করা উচিত আর কোনটা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে— সেই সীমানা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কলকাতা পুলিশে এই ব্যবস্থা সফলভাবে কার্যকর করার পর খুব শীঘ্রই রাজ্য পুলিশের অধীনে থাকা বাকি এক লক্ষেরও বেশি সিভিক ভলান্টিয়ারের ক্ষেত্রেও এই একই মডেল চালু করা হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনটি আসতে চলেছে সিভিকদের চাকরির ধারাবাহিকতায়। লালবাজার সূত্রে স্পষ্ট খবর— এবার থেকে আর বসে বসে সরকারি ভাতা নেওয়ার দিন শেষ। প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রতিটি সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজের মূল্যায়ন বা পারফরম্যান্স রিভিউ করবেন সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা। সেই মূল্যায়নে তাঁদের সততা, শৃঙ্খলা ও কাজের দক্ষতা উত্তীর্ণ হলে তবেই মিলবে চাকরিতে বহাল থাকার সবুজ সংকেত; অন্যথায় হতে হবে চাকরিচ্যুত!
ক্ষমতায় আসার পরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন— বিগত তৃণমূল সরকার নিজেদের দলীয় ক্যাডারদের পুনর্বাসন দিতে এবং বিরোধীদের দমাতে এই সিভিক বাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। নতুন সরকার কোনো দলীয় পোষা ক্যাডার পুষবে না; মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যাঁরা উপযুক্ত, তাঁদের রেখে বাকিদের পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই কড়া বার্তার পথ ধরেই এবার সিভিকদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে চূড়ান্ত প্রশাসনিক অ্যাকশনে নামল লালবাজার। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পুলিশি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে এক বিরাট যুগান্তকারী বার্তা দিল গোটা বাংলাকে!
