লড়াই, প্রতিরোধ আর নারীশক্তির আত্মমর্যাদার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনের সাক্ষী হতে চলেছে তিলোত্তমা কলকাতা! উৎসবের মরশুমে শহরের বুকে রচিত হতে চলেছে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসন কাটিয়ে শহরে ফেরা বিতর্কিত ও স্পষ্টবক্তা লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে এবার একই মঞ্চে দেখা যেতে চলেছে আর জি কর কাণ্ডের প্রতীকী লড়াইয়ের মুখ, নির্যাতিতা অভয়ার মা তথা বিধায়ক রত্না দেবনাথকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘লে রিদম্’-এর আমন্ত্রণে আগামী ৮ই অক্টোবর ফের শহরে পা রাখছেন তসলিমা। আর তাঁদের এই আগমনকে ঘিরেই এখন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোড়ন।
দরিদ্র ও দুঃস্থ শিশুদের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী করে তোলার কাজে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছে সংস্থা ‘লে রিদম্’। সংস্থার কো-ফাউন্ডার রাজীব মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন— কলকাতার ঐতিহাসিক মহাজাতি সদনে আয়োজিত হতে চলেছে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যার শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘শিকল ভাঙার গল্প’। নারীশক্তির জাগরণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার বার্তা নিয়ে তৈরি এই অনুষ্ঠানে লেখিকা তসলিমা নাসরিনের হাতে তুলে দেওয়া হবে মর্যাদাপূর্ণ ‘উমা’ সম্মান।
কিন্তু অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চমক ও নাটকীয় মোড় অপেক্ষা করছে ঠিক এখানেই! এই একই মঞ্চ থেকে তসলিমার পাশাপাশি ‘উমা’ সম্মানে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূষিত করা হবে অভয়ার মা রত্না দেবনাথকেও। বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা এক মা এবং মৌলবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কলম ধরা এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখিকা— দুই অপরাজিত নারী যখন একই মঞ্চে পরস্পরের মুখোমুখি হবেন, তখন তা যে নারী আন্দোলনের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।
আগামী ৮ই অক্টোবর কলকাতায় পা রেখে ১২ই অক্টোবর পর্যন্ত শহরের একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তসলিমা নাসরিন। এর আগে রবীন্দ্র সদনে তাঁর ‘ফেরা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি শহরের সংস্কৃতিপ্রেমীদের মন জয় করেছিল। এবার মহাজাতি সদনে তসলিমার নিজস্ব নির্দেশনায় এবং প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মৈত্রী পাহাড়ির নিখুঁত কোরিওগ্রাফিতে মঞ্চস্থ হবে ‘শিকল ভাঙার গল্প’।
আয়োজকদের তরফ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে— সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন। তবে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও নিশ্ছিদ্র সুরক্ষার স্বার্থে দর্শকদের অনলাইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সরকারি পরিচয়পত্রের বিবরণ নথিভুক্ত করে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে হবে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৯ বছর পর গত জুলাই মাসে যখন কলকাতায় প্রথম পা রেখেছিলেন তসলিমা নাসরিন, তখন নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ২০০৭ সালে মৌলবাদী চাপের মুখে তাঁকে এই শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। সেদিন আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন— ভেবেছিলেন প্রগতিশীল এই শহরে আর কোনোদিন হয়তো ফিরতেই পারবেন না। কিন্তু সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে সেই তসলিমা আজ আবার কলকাতার রাজপথে, আর এবার তাঁর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন সন্তানহারা লড়াকু মা। মহাজাতি সদনের এই যৌথ মঞ্চ অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিকল ভাঙার কোন নতুন ইতিহাস লেখে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বাংলা।
