গায়ক থেকে রাজনীতিবিদ আর আজ দূর্নীতির কেন্দ্রে!কোটি কোটি টাকার পুজো পাস কেলেঙ্কারিতে ইতি ইন্দ্রনীলের রাজনৈতিক যাত্রায়!

বাম জমানার বুদ্ধিজীবী বৃত্ত থেকে সোজা ঘাসফুল শিবিরের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু— রাজনীতিতে ইন্দ্রনীল সেনের উত্থান যেন কোনো নাটকীয় উল্কার গল্পের চেয়ে কম ছিল না! সুরের জগতের মানুষ হয়েও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহের ছায়াতলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অলিখিত ‘খাস লোক’। দলীয় মঞ্চ থেকে সরকারি অনুষ্ঠান— মমতার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর গান গাওয়া আর দিদির সুর মেলানো ছিল বাংলার রাজনীতির পরিচিত এক দৃশ্যপট। কিন্তু ক্ষমতার সেই সুর কাটতে সময় লাগেনি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চন্দননগরের চেনা পিচে শোচনীয় পরাজয়ের পর এবার দুর্গাপুজোর পাস কেলেঙ্কারির অভিযোগে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সের দরজা থেকেই নাটকীয়ভাবে কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেন রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন!

কী এই মামলা যার জেরে শ্রীঘরের পথ দেখতে হলো দিদির প্রিয় গায়ক-মন্ত্রীকে? তদন্তকারী সংস্থা সূত্রের খবর— ইউনেস্কোর নাম অপব্যবহার করে দুর্গাপুজোর ভিআইপি প্রিভিউ পাসের অবৈধ টিকিট বিক্রি এবং ‘ম্যাসআর্ট’ সোসাইটি নামক একটি সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক নয়ছয় ও তছরুপের অভিযোগ ওঠে ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে। বউবাজার থানায় জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা এফআইআরের ভিত্তিতে এই আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্তে নেমেছিল পুলিশ ও ইডি। বুধবার ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরোনোর মুহূর্তেই কলকাতা পুলিশের ডিডি স্পেশাল সেল তাঁকে হেফাজতে নেয়। সুজিত বসুর গ্রেফতারির পর তৃণমূলের পূর্বতন মন্ত্রীসভার আরও এক শীর্ষ নেতার এই পতন নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক মহলে এক প্রবল ভূকম্পন তৈরি করেছে।

কিন্তু এই বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ঠিক কত কোটি টাকার সম্পত্তির পাহাড় গড়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন? ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জমা দেওয়া তাঁর হলফনামার দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল সেনের নিজের হাতে নগদ ছিল ১ লক্ষ ৪৬ হাজার ৭৪০ টাকা এবং একাধিক ব্যাঙ্কে রয়েছে প্রায় ৩ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট ও ৬টি সেভিংস অ্যাকাউন্ট। গাড়ির তালিকায় রয়েছে দুটি গাড়ি— যার একটির ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৪৮ হাজার এবং অন্যটি ২ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকার বেশি। তাঁর কাছে রয়েছে ৩২ গ্রাম ওজনের সোনা, যার বাজারমূল্য ৪ লক্ষ ১৭ হাজার টাকারও বেশি। এছাড়া শেয়ার বাজারে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর মোট ২৩টি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। হলফনামা বলছে, প্রাক্তন এই মন্ত্রীর মোট অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ২ কোটি ৩৬ লক্ষ ২৭ হাজার ৩৫১ টাকা!

স্থাবর সম্পত্তির হিসাবে ইন্দ্রনীল সেনের খতিয়ান আরও চমকপ্রদ। কলকাতার গড়িয়াহাট ও কসবায় তাঁর দুটি সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবনের বড় অংশ রয়েছে— যার বর্তমান বাজারমূল্য যথাক্রমে প্রায় ৫৬ লক্ষ এবং ২ কোটি ৬ লক্ষ টাকারও বেশি! পাশাপাশি গড়িয়াহাট ও কসবায় রয়েছে তাঁর দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে ইন্দ্রনীল সেনের মোট স্থাবর সম্পত্তির সরকারি ঘোষিত বাজারমূল্যই প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লক্ষ ৩৬ হাজার ৬২৪ টাকা!

তবে ইন্দ্রনীল সেনের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনের সম্পত্তির বহরও কিছু কম নয়। বিভিন্ন অর্থবর্ষে মধুছন্দাদেবীর ঘোষিত বার্ষিক আয় ছিল ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৪ লক্ষ টাকারও বেশি! তাঁর ১১টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি রয়েছে প্রায় দেড় কোটির বেশি অস্থাবর সম্পত্তি। আর স্থাবর সম্পত্তির তালিকায় হুগলির সিঙ্গুরে রয়েছে ২ কোটি ৯ লক্ষ টাকারও বেশি মূল্যের বিস্তৃত জমি এবং প্রায় ২ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা মূল্যের প্রায় ১৪০০ বর্গফুটের এক বিশাল ফ্ল্যাট!

মঞ্চে গান ভুলে গেলে যেখানে দলনেত্রী পরম স্নেহে বলে উঠতেন “ইন্দ্রনীল ভুল হচ্ছে”, আজ কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির এই জালে জড়িয়ে সেই সুর আর তাল দুটোই সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন ইন্দ্রনীল সেন। সাধারণ মানুষের করের টাকা ও বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে ঘিরে এই দুর্নীতির শিকড় কত দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর গোটা বাংলার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *