জঙ্গলমহলের মাটির গন্ধ আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে ফের এক আন্তরিক ও সামাজিক সমীকরণের সাক্ষী হতে চলেছে দক্ষিণ বাঁকুড়া! গত সেপ্টেম্বর মাসে পুরুলিয়ার মাটিতে আয়োজিত আদিবাসী কুড়মি সমাজের করম উৎসবে উপস্থিত হয়ে স্বজন ও আপনজনের মতো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে এসেছিলেন— তিনি কুড়মি মা-বোনেদের হাতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী পিঠে খেতে চান। মুখ্যমন্ত্রীর সেই আন্তরিক ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে এবং তাঁকে রাজকীয় আতিথেয়তায় বরণ করে নিতে এবার জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল বাঁকুড়ায়। চলতি মাসের ১২ তারিখ দক্ষিণ বাঁকুড়ার রায়পুরের হলুদকানালি পিঁড়রায় বিরসা মুন্ডা মেমোরিয়াল কলেজের সুবিশাল মাঠে আয়োজিত হতে চলেছে ঐতিহাসিক ‘বাঁদনা পরব’। আর সেই জমজমাট মঞ্চেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা পিঠে খাইয়ে আপ্যায়ন করবেন কুড়মি সমাজের নেতৃত্ব ও মহিলারা!
বাঁকুড়া জেলা বাঁদনা পরব কমিটির ব্যানারে এই বিশাল আয়োজন হলেও এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে আদিবাসী কুড়মি সমাজ। মঙ্গলবার দক্ষিণ বাঁকুড়ার অম্বিকানগরের কেশরা হাইস্কুলে এক বিশেষ প্রস্তুতি সভার আয়োজন করা হয়। তার আগে অম্বিকানগরেই বসে সংগঠনের রাজ্য কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক। বৈঠক শেষে সংগঠনের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো স্পষ্ট জানান— “করম পরবের মতো বাঁদনার এই অনুষ্ঠানও সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে বাঁদনা পরবে আসছেন, আর তাঁর দেওয়া কথা অনুযায়ী আমরা তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় ঘরের তৈরি ঘিয়ে ভাজা পিঠে খাওয়াব।” সংগঠনের বাঁকুড়া জেলা সভাপতি ফুলচাঁদ মাহাতোর কথায়— “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের কাছে এক সম্মানিত ‘কুটুম’ বা আত্মীয়। বাঁদনা পরবের চিরাচরিত আদিবাসী রীতিনীতি ও লোকসংস্কৃতির প্রতিটি পরত আমরা মুখ্যমন্ত্রীর সামনে সগৌরবে তুলে ধরব।”
তবে এই মিষ্টি সাংস্কৃতিক উৎসবের সমান্তরালেই জঙ্গলমহলের বুকে বইছে আদিবাসী তালিকাভুক্তির এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতের স্রোত। সম্প্রতি পুরুলিয়ার মানবাজারের পাথরকাটা ফুটবল ময়দানে আয়োজিত বৃহত্তর আদিবাসী মহাসমাবেশ থেকে কুড়মিদের এসটি তালিকাভুক্তির জোরালো দাবির বিরুদ্ধে তীব্র হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। সেই বিরোধিতাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে এবার সরাসরি পাল্টা আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কুড়মি সমাজের রাজ্য কমিটি।
মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো চাঁচাছোলা ভাষায় জানান— “মানবাজারের সমাবেশ থেকে কুড়মি সমাজের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। বহু সাধারণ সাঁওতাল ভাই-বোন আজও আমাদের পাশে রয়েছেন এবং আমাদের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক ও যথার্থ বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে কিছু ব্যক্তি সমাজে বিভাজন তৈরির চক্রান্ত করছেন। আমরা এর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেব এবং ১২ তারিখের বাঁদনা পরবের মঞ্চে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ তাঁর সামনে পেশ করব।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে— বঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একদিকে যেমন জঙ্গলমহলে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি পোক্ত হয়েছে, ঠিক তেমনই আদিবাসী কুড়মি সমাজও নিজেদের সামাজিক আন্দোলনকে শুধু জঙ্গলমহলেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড এবং উত্তরবঙ্গেও সংগঠন বিস্তার শুরু করেছে তারা। সম্প্রতি মূল মানতা নিজে আলিপুরদুয়ার সফর করেছেন এবং গত এক মাস ধরে পুরুলিয়ার কাশিপুর, হুড়া, বান্দোয়ান, জয়পুর সহ একাধিক ব্লকে ঘুরে সংগঠনের মহিলা শাখা ‘মেহরারু দঁহগী’কে নতুন শক্তিতে ঢেলে সাজানোর কাজ চালাচ্ছেন।
ঐতিহ্যের বাঁদনা পরব, ঘিয়ে ভাজা পিঠের মিষ্টি স্বাদ আর সেই মঞ্চেই এসটি তালিকাভুক্তির দীর্ঘদিনের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকারের সওয়াল— রায়পুরের হলুদকানালি পিঁড়রায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই আসন্ন সফর যে প্রশাসনিক ও সামাজিক দুই দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!