বাংলায় ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতা হরণ করার যে ‘বিজেপি ঘরানা’, তার নগ্ন রূপ আবার সামনে এলো। একদিকে নবান্নের সভাঘর থেকে মিষ্টি কথার মোড়কে সাংবাদিকদের ওপর অলিখিত ফতোয়া জারি করছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অন্যদিকে শহরের বুকে ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয়ে জোর করে গেরুয়া রং লেপে দিয়ে চলছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন। সরকারের জনবিরোধী নীতি ও দুর্নীতি ফাঁস রোধ করতে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের এই দ্বিভূজ চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল মহল।
মঙ্গলবার নবান্নের সভাঘরে সাংবাদিকদের জন্য ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’ এবং পেনশন বৃদ্ধির ডালি সাজিয়ে বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু সেই উপহারের মোড়ক খুলতেই বেরিয়ে পড়ে শাসকের আসল চেহারা। ডান হাতে বিমার সুযোগ দিয়ে বাঁ হাতে কলমের টুঁটি চেপে ধরার অসাধু চেষ্টা চালাচ্ছে রাজ্য সরকার। নবান্নের মঞ্চ থেকে সাংবাদিকদের কী লেখা উচিত আর কী লেখা উচিত নয়, ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘ধর্মীয় আস্থা’র চাদরে মুড়ে তার অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করাই যেখানে সংবাদমাধ্যমের মূল ধর্ম, সেখানে ‘জাতীয়তাবাদের ছাঁকনিতে’ খবর ছাঁকার এই সুচতুর নির্দেশ আদতে গণমাধ্যমকে পোষ মানানোর এক সোনার খাঁচা ছাড়া আর কিছুই নয়।
নবান্নের এই ফতোয়ার পাশাপাশি বাস্তব জমিতেও নেমে এসেছে ক্ষমতার দম্ভ। সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয়ের দেওয়ালে জোর করে রং লেপে দেওয়ার একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর এই উগ্র মানসিকতার হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সার্বিক সংহতির স্বার্থে তৃণমূল যে সর্বদা পাশে থাকবে, সেই বার্তা দিয়ে ঘটনাস্থলে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠায় তৃণমূল নেতৃত্ব।
প্রতিনিধিদলে থাকা সাংসদ সৌগত রায়, দোলা সেন, প্রাক্তন বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এবং প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক মারিয়া ফার্নান্ডেজ সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন ও সংবাদকর্মীদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বলেন, গেরুয়া হলো ত্যাগ ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য সেই রঙের অপব্যবহার করে তার অমর্যাদা করা হচ্ছে।
সাংসদ দোলা সেনও জানান, সংবাদমাধ্যমের দফতরে এহেন উগ্র আচরণ এবং জোর করে নির্দিষ্ট মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাজদণ্ড দেখিয়ে সাংবাদিকদের সততা ও স্বাধীন মতামতকে দমিয়ে রাখার এই বিজেপি ঘরানার বিরুদ্ধে এখন একজোট হয়ে লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছেন রাজ্যের সচেতন নাগরিকেরা। সংবাদমাধ্যমের বাক্স্বাধীনতা হরণ ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত কখনোই মেনে নেবে না গণতন্ত্রপ্রিয় সাধারণ মানুষ।
সুবিধার চাদরে ঢাকা এই অলিখিত ফতোয়া ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আগামী দিনে আরও তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে ওয়াকিবহাল মহল। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের এই চক্রান্ত ব্যর্থ করে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার অধিকার রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই জারি থাকবে।
